ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সংজ্ঞা পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার, এবার সেই একই পথে হেঁটে উল্টো দিকের চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। আগের সরকারের আমলে লুকিয়ে রাখা প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ্যে আনার যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, তাতে গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এই পরিসংখ্যানের কারণে বিশ্বে এখন সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণের সংখ্যা কাগজে-কলমে কমিয়ে দেখাতে পুরোনো হিসাব পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে টানা তিন মাস কিস্তি অপরিশোধিত থাকলেই কোনো ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে নতুন করে পুরোনো নিয়মে ফেরা হলে মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা বাড়িয়ে নয় মাস করা হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, খেলাপি গ্রাহকদের নতুন করে অর্থায়নের সুযোগ থেকে বিরত রাখার এই কঠোর নিয়ম আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই কড়াকড়ি সুফল বয়ে আনছে না বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। তার ভাষায়, ঋণ শ্রেণিকরণের বিদ্যমান মানদণ্ড নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
তবে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এই চিন্তাভাবনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন। তাদের আশঙ্কা, পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাংখ্যিক লক্ষ্যমাত্রা কাগজে-কলমে পূরণ হলেও প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ আদায়ে কোনো অগ্রগতি হবে না।
ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনের কড়া সমালোচনা করে বলেন, প্রকৃত খেলাপিকে খেলাপি না বলার এই প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তার মতে, পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে গেলে পরিসংখ্যানে খেলাপি ঋণের হার কমানো সম্ভব হলেও বাস্তবে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না, বরং প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়ে যাবে।
একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক একজন প্রধান অর্থনীতিবিদও। তার মতে, শিথিল নিয়মের সুযোগ নিয়ে যেসব ব্যাংক অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করেছে অথচ তা আদায় করতে পারেনি, তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা শিথিল হয়ে যাবে। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জেনে বা না জেনে ধীরে ধীরে দেউলিয়া হওয়ার মতো গুরুতর সংকটের দিকে এগিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকৃত তথ্য আড়াল করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানোর সংস্কৃতিতে আবার ফিরে গেলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের ব্যাংকিং খাত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিদ্যমান পরিস্থিতিও এমনিতেই যথেষ্ট উদ্বেগজনক—আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে অধিকাংশ ব্যাংক। গত জুন শেষে এই খাতে সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ২২ হাজার কোটি টাকায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্য নিরূপণ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের কোনো বিকল্প নেই। এই মুহূর্তে সংজ্ঞা পরিবর্তনের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

