ব্যাংক এমডিদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কেপিআই বা মূল কর্মদক্ষতা সূচক নীতিমালা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ বা এবিবির চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেছেন, সার্বিকভাবে একটি লিখিত, পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকা ইতিবাচক একটি উদ্যোগ, কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর এমডিদের পর্যাপ্ত কর্মক্ষমতা দেওয়া, দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে আলাদা বিবেচনা রাখা এবং একজন এমডির নির্দিষ্ট ব্যাংকে কাজের অভিজ্ঞতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া।
মাসরুর আরেফিন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নীতিমালার প্রাথমিক দিকটি নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন সন্তোষজনক। তাঁর মতে, ব্যাংক এমডিদের কাজের মান এখন থেকে শুধু মুনাফার অঙ্ক দিয়ে বিচার না করে মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি, ঋণ আদায়ের হার, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, গ্রাহকসেবার মান, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সাইবার সুরক্ষা, এই একাধিক মাত্রায় যাচাই করার পরিকল্পনাটি সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশের ব্যাংকিং খাতে ইতিমধ্যে যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো চালু আছে, নতুন এই কেপিআই ব্যবস্থাও তার সঙ্গেই সংগতিপূর্ণভাবে যুক্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে এবিবি চেয়ারম্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, একজন এমডিকে যে ফলাফলের ভিত্তিতে জবাবদিহি করতে হবে, সেই ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও তাঁর হাতে থাকা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনার মধ্যে দায়িত্বের সীমারেখা এখনো অনেক জায়গায় স্পষ্ট নয়। ঋণের গুণগত মান, আদায়, সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি বা জনবলের দক্ষতার মতো বিষয়ে একজন এমডিকে কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হলে, অথচ এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর হাতে সীমিত থাকলে সেই মূল্যায়ন প্রকৃত অর্থে ন্যায্য হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সমস্যাগ্রস্ত বা দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর বলে জানান মাসরুর আরেফিন। তাঁর মতে, একজন নতুন এমডি এমন কোনো ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে পারেন যেখানে বহু বছরের পুঞ্জীভূত মন্দ ঋণ, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি, সুশাসনের দুর্বলতা বা কোনো বিশেষ খাতে ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকার মতো ঝুঁকি আগে থেকেই বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে বড় কোনো পরিবর্তন আনা বাস্তবসম্মত নয়। সব ব্যাংকে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করলে একজন এমডির কাজ শুরুর প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পুরোনো সমস্যাগুলো বিবেচনায় থাকে না বলে তিনি সতর্ক করেন। এতে দক্ষ পেশাদার ব্যাংকারেরাও দুর্বল ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে অনুৎসাহিত হতে পারেন বলে তাঁর আশঙ্কা।
এই প্রসঙ্গে তিনি পরামর্শ দেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিমালা প্রণয়নের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল এবিবির অভিজ্ঞ কয়েকজন ব্যাংক এমডির সঙ্গে আলোচনা করা, যাতে নীতিমালাটি বাস্তবতার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ ও কার্যকর হতে পারত।
সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, লিখিত ও স্বচ্ছ একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকাকে তিনি সমর্থন করেন, কিন্তু তার সাফল্য নির্ভর করবে এমডিদের পর্যাপ্ত ক্ষমতা দেওয়া, দুর্বল ব্যাংকের প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে বিবেচনা করা এবং অভিজ্ঞতাকে যথাযথ মূল্য দেওয়ার ওপর। তিনি বলেন, এমডিদের জবাবদিহি বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের নিজস্ব জবাবদিহিও দেশের ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকা উচিত।

