দেশের কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়লেও একই সঙ্গে বাড়ছে ঋণ ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি। বিশেষ করে ৯টি ব্যাংকের কৃষি ও পল্লি ঋণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লি ঋণ পরিস্থিতি-বিষয়ক জুলাই ২০২৬-এর মাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯টি ব্যাংকের খেলাপি কৃষিঋণ চলতি বছরের জুলাই শেষে দাঁড়িয়েছে ৮৪৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪১৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এসব ব্যাংকের খেলাপি কৃষিঋণ বেড়েছে ১০২ দশমিক ২৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে এসব ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জুলাই ২০২৫-এ যেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল ৪০৫ কোটি ৩ লাখ টাকা, চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এক বছরে এই ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৯৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
তবে খেলাপি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বাড়লেও কৃষিঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জুলাই ২০২৫-এ ৯টি ব্যাংক কৃষি ও পল্লি খাতে ৪২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৫৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে এসব ব্যাংকের আদায়যোগ্য কৃষিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ৩৩৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেছে। জুলাই ২০২৫-এ যেখানে কৃষিঋণ আদায় হয়েছিল ৪৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮৭ কোটি ৪ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কৃষিঋণ আদায় বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯টি ব্যাংকের কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৫৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
জুলাই মাসে পুরো ব্যাংক খাতে কৃষিঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৯টি ব্যাংকের বিতরণ ছিল ৫৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা মোট কৃষিঋণ বিতরণের ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ।
৯টি ব্যাংকের মধ্যে জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটি এ সময়ে ২৯২ কোটি ১৭ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। একই মাসে ব্যাংকটির কৃষিঋণ আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। জুলাই শেষে ইসলামী ব্যাংকের কৃষিঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
কৃষিঋণ বিতরণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউসিবি পিএলসি। ব্যাংকটি জুলাইয়ে ১২৮ কোটি ২১ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। একই সময়ে ব্যাংকটির কৃষিঋণ আদায় হয়েছে ৭২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং জুলাই শেষে ঋণের স্থিতি ছিল ৬৪১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
এ ছাড়া আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ৬৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৩৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা কৃষিঋণ দিয়েছে।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক জুলাই মাসে কোনো কৃষিঋণ বিতরণ করেনি। তবে ব্যাংকটি এ সময়ে ৩৪ লাখ টাকা ঋণ আদায় করেছে। জুলাই শেষে ব্যাংকটির কৃষিঋণের স্থিতি ছিল ৭৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণ বৃদ্ধি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। কৃষি খাতে ঋণ নেওয়া অনেক গ্রাহক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের ওঠানামা এবং আয় অনিশ্চয়তার কারণে সময়মতো ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়তে পারেন।
এ কারণে শুধু ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের সক্ষমতা যাচাই, নিয়মিত তদারকি এবং কার্যকর আদায় ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কৃষি খাতে অর্থায়ন সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংক ও কৃষক—উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, কৃষিঋণ সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন এবং খেলাপি নিয়ন্ত্রণ এখন ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

