দেশের ব্যাংক খাতে এখন প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই আদায় হচ্ছে না। এই দুরবস্থার মধ্যেও ১৩টি বেসরকারি ব্যাংক নিজেদের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত জুন পর্যন্ত এই ব্যাংকগুলোর অবস্থান সামগ্রিক চিত্রের চেয়ে অনেক ভালো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের হিসাবে এর হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সূচক অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের অনুপাতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সবার ওপরে। এই তালিকায় শীর্ষে থাকা কারও জন্যই গর্বের নয়।
তবু সব ব্যাংকের গল্প এক নয়। যে ১৩টি ব্যাংকের খেলাপি হার ৫ শতাংশের নিচে, তারা সবাই বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে যেমন দেশের প্রথম প্রজন্মের পুরোনো ব্যাংক আছে, তেমনি আছে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকও। অর্থাৎ ব্যাংকের বয়স বা প্রজন্ম এখানে মুখ্য বিষয় নয়। তালিকায় আছে কমিউনিটি, ব্র্যাক, পূবালী, সিটিজেনস, প্রাইম, সিটি, ইস্টার্ন, যমুনা, বেঙ্গল কমার্শিয়াল, এনসিসি, উত্তরা, শাহ্জালাল ইসলামী ও সীমান্ত ব্যাংক।
সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে কমিউনিটি ব্যাংক। গত জুনে ব্যাংকটির মোট ঋণ ছিল ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি মাত্র ৫ কোটি টাকা। ফলে খেলাপির হার শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। এটি দেশের গড় হারের প্রায় একশ ভাগের এক ভাগ। তবে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক ছোট, তাই বড় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি তুলনায় এই বিষয়টিও মাথায় রাখা দরকার।
দ্বিতীয় স্থানে ব্র্যাক ব্যাংক, যেটি বড় আকারের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো করছে। ব্যাংকটি মোট ৭৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা খেলাপি, অর্থাৎ হার ২ দশমিক ০৫ শতাংশ। দেশি মালিকানার ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুনাফায় এখন ব্যাংকটি সবার আগে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফোর্বসের বিশ্বসেরা ৫০০ ব্যাংকের তালিকায়ও জায়গা পেয়েছে তারা। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ঋণ অনুমোদনে সুশাসন আর ঝুঁকির সঠিক মূল্যায়নই তাদের আসল শক্তি। কোনো অনৈতিক চাপ ছাড়া, নিরপেক্ষভাবে গ্রাহকের পরিশোধ-সক্ষমতা যাচাই করেই তারা ঋণ দেন।
তৃতীয় অবস্থানে পূবালী ব্যাংক, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৭২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা, আর খেলাপি ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, এই ব্যাংকে কোনো ঋণ একজন ব্যক্তির সুপারিশে অনুমোদন হয় না, প্রতিটি ঋণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া মেনে পাস হয়। তাঁর দাবি, বড় ঋণের বেশির ভাগই গেছে খাদ্যপণ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও তৈরি পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় খাতে, যেখানে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। এখন তারা ভোক্তা ঋণের দিকেও বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
চতুর্থ স্থানে থাকা সিটিজেনস ব্যাংকের খেলাপি হার ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ষষ্ঠ স্থানে সিটি ব্যাংকের খেলাপি ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা, হার ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন মনে করেন, স্বাধীন ঋণ অনুমোদন এবং ঋণের বৈচিত্র্যই তাদের সুবিধা দিয়েছে। তাঁর মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং ভোক্তা ঋণে জোর দেওয়া ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো করছে।
সপ্তম স্থানে ইস্টার্ন ব্যাংক, যেখানে খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, হার ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। এরপর অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ স্থানে আছে যমুনা ব্যাংক (৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ), বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক (৪ দশমিক ০৭ শতাংশ), এনসিসি ব্যাংক (৪ দশমিক ১৯ শতাংশ), উত্তরা ব্যাংক (৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ), শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক (৪ দশমিক ৮২ শতাংশ) ও সীমান্ত ব্যাংক (৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ)।
এই ভালো ব্যাংকগুলোর পাশে খারাপ অবস্থার ব্যাংকগুলোর চিত্র দেখলে বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়। দেশের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই কেন্দ্রীভূত মাত্র ১০টি ব্যাংকে। এই ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। বাকি সব ব্যাংক মিলিয়ে খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সংকটের বড় অংশই সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে জমে আছে।
টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি খেলাপি বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার ৭৫ টাকার বেশিই এখন খেলাপি।
হারের বিচারে সবচেয়ে বিপর্যস্ত একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ ও ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের হার ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ। ন্যাশনাল ব্যাংকে ৬৫ দশমিক ৭৪, আইএফআইসি ব্যাংকে ৬৩ দশমিক ৩৮ ও এবি ব্যাংকে ৫৬ দশমিক ৪০ শতাংশ ঋণ খেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকেও এই হার ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
তাহলে ভালো ব্যাংকগুলোর সাফল্যের রহস্য কী? ব্যাংকাররা মোটামুটি একই কয়েকটি কারণের কথা বলছেন। প্রথমত, ঋণ অনুমোদন হয় নিয়ম মেনে, স্বাধীনভাবে, বাইরের চাপ ছাড়া। দ্বিতীয়ত, ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহক আসলে ফেরত দিতে পারবেন কি না, তা যাচাই করা হয়। তৃতীয়ত, ঋণ কেবল বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে যায় না, ছড়িয়ে পড়ে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা এবং সাধারণ ভোক্তার মধ্যেও। বড় একটি ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংক টালমাটাল হয়ে যায়, কিন্তু অসংখ্য ছোট ঋণে ঝুঁকি ভাগ হয়ে যায়।
এ নিয়ে কথা বলেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান। তাঁর মতে, উচ্চ খেলাপির এই বাজারেও যারা ভালো করছে, তারা কর্পোরেট সুশাসন মেনে চলে। কোনো ব্যাংক কেমন, তা তার পরিচালনা পর্ষদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আমানতকারীরাও এখন টাকা রাখার আগে এসব বিষয় খেয়াল করেন। দক্ষ ব্যাংকাররা এমন প্রতিষ্ঠানেই কাজ করতে চান, আর সেটিও ব্যাংকগুলোর ঋণের মান ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ, কম খেলাপির ব্যাংকগুলো শুধু ঋণের মানেই এগিয়ে নেই। তাদের আর্থিক ভিত্তি তুলনামূলক মজবুত, মুনাফা বেশি এবং আমানতও অন্য ব্যাংকের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ ভালো ঋণ ব্যবস্থাপনা এখানে আমানতকারীর আস্থা ও ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তবে এই ব্যাংকগুলো খেলাপি সংকটের সমাধান নয়। সামগ্রিক চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। কিছু ব্যাংকের ভালো অবস্থান পুরো খাতের ঝুঁকি কমায় না, বরং দেখিয়ে দেয় যে সুশাসন থাকলে ভিন্ন ফল সম্ভব। খেলাপি ঋণ কমাতে হলে বাকি ব্যাংকগুলোর জন্যও এই শিক্ষাই প্রাসঙ্গিক: স্বচ্ছ ঋণ অনুমোদন, নিরপেক্ষ যাচাই এবং ঋণের বৈচিত্র্য।

