দেশ থেকে নানা উপায়ে অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার ধারা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সেই অর্থ বিদেশে বাড়ি, গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে নতুন কারখানা, ব্যবসা ও আবাসনের মতো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের গতি কমছে।
বর্তমান সরকারের সময়ে পাচারের প্রবণতা কমেছে বলে জানিয়েছে দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর ও সিআইডি। তবে তা পুরোপুরি থামেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাচার ঠেকাতে যেমন অবৈধ অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করতে হবে, তেমনি দেশে বৈধ বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ, লাভজনক ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশও গড়তে হবে।
আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক হারে পাচারের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তা চলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাচারের পরিমাণ নিয়ে একাধিক হিসাব আছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) চলতি বছরের মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ অর্থপ্রবাহ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার। গড়ে বছরে ৬৮৩ কোটি ডলার, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৮৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর শ্বেতপত্র কমিটি ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের হিসাব করে মোট প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাচারের কথা জানিয়েছে। তাদের হিসাবে বছরে গড় পাচার ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশি কোম্পানিগুলোর নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। বছর শেষে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি ১০ লাখ ৮০ হাজার ডলার, যা ১৮টি দেশে ছড়িয়ে আছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, এই তথ্যে ব্যক্তিগতভাবে বিদেশে কেনা বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, সেকেন্ড হোম বা বিদেশি ব্যাংক হিসাবের সম্পদ ধরা হয় না। ফলে পরিসংখ্যানের তুলনায় বিদেশে বাংলাদেশিদের প্রকৃত সম্পদ বহু গুণ বেশি হতে পারে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের রিপোর্ট বেড়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে দাঁড়িয়েছে। এক বছরে বেড়েছে ৭৪ শতাংশ। সংস্থাটির ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রক নজরদারি, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুবর্তিতা এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণ বেড়েছে। এ ছাড়া সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্যমতে, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিক ও বাংলাদেশি ব্যাংকের নামে জমা ছিল ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। টাকার হিসাবে তা প্রায় ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এক বছরে এই অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
দেশের ভেতরের চিত্রও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ নেমেছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পর এটি সর্বনিম্ন। অর্থাৎ দেশে বিনিয়োগ কমছে, আর অর্থ বিদেশে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, বাণিজ্যভিত্তিক পাচার শনাক্তে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বিএফআইইউ। কাস্টমস, কর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ব্যাংকিং খাতের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং ঝুঁকি শনাক্তকরণ বাড়াতে একটি আন্তসংস্থা স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর বিএফআইইউ জাতীয় অর্থ পাচার ঝুঁকি মূল্যায়ন কর্মশালা করেছে। ১৩ মে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে যৌথ কর্মশালা এবং ৮-৯ মে ক্যামলকো সম্মেলনও হয়েছে।
পাচারের প্রচলিত কৌশল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কয়েকটি পদ্ধতি:
- পণ্যের প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং)
- প্রকৃত দামের চেয়ে কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং)
- ভুয়া আমদানি বা রপ্তানি
- একই পণ্যের দাম বা পরিমাণ নিয়ে মিথ্যা তথ্য
- একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ ঘুরিয়ে দেওয়া
- হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক পথ
চলতি বছরের ৯ জুন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ভবিষ্যতে অর্থ ও মূলধন পাচার ঠেকাতে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ আইনি কাঠামো হালনাগাদ করা হবে। প্রকৃত মালিকানার নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুসহ আইনি সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএফআইইউর এক কর্মকর্তা জানান, সাইপ্রাস, ফিলিপাইন, ভারত, লুক্সেমবার্গ, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, জার্সি, গার্নসি, আইল অব ম্যান এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের মতো দেশ ও অফশোর এখতিয়ারেও অর্থের গতিপথের তথ্য পাওয়া গেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর ফাঁকি এবং আমদানি-রপ্তানিতে চালান জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে। এ জন্য এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যোগসাজশের দুর্নীতিও থামাতে হবে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডে (সিআরএস) অবিলম্বে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা দরকার। এতে দেশি-বিদেশি সব লেনদেনের তথ্য এনবিআর ও বিএফআইইউর নজরদারির আওতায় আনা যাবে। বেনামি কোম্পানির মাধ্যমে জালিয়াতি ঠেকাতে প্রকৃত মালিকানার স্বচ্ছতা আইন করে চূড়ান্ত মালিকানার রেজিস্টার উন্মুক্ত করার কথাও তিনি বলেন। পাশাপাশি দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর ও সিআইডির দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। তাদের মধ্যকার অসহযোগিতামূলক সম্পর্কের জায়গায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় আনতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, পাচার বন্ধের পাশাপাশি দেশে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়াতে না পারলে স্থায়ী সমাধান কঠিন। উদ্যোক্তা তখনই দেশে অর্থ খাটাবেন, যখন তিনি মনে করবেন সম্পদ নিরাপদ, ব্যবসার নিয়ম স্থিতিশীল এবং মুনাফার পূর্বাভাস নির্ভরযোগ্য। এ জন্য তিনি কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন:
- বিনিয়োগ অনুমোদনের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা
- কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু
- কর ও শিল্পনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা
- শিল্পের জন্য জমি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিশ্চিত করা
- পরিবহন ও বন্দরসেবা সহজ করা
- ব্যাংক ঋণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো
ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিনিয়োগ পরিকল্পনাতেও নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, দীর্ঘমেয়াদি কর-স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত খাতে প্রণোদনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ঘোষিত সংস্কারের মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন জরুরি।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, সঠিক তথ্য, স্থিতিশীল নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগ পরিবেশ, এই চারটির সমন্বয়ই ঠিক করবে উদ্যোক্তার অর্থ দেশে থাকবে, নাকি বিদেশে সুযোগ খুঁজবে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, নীতিনির্ধারক ও শিল্প খাতের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি ব্যবসায়িক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের আগে স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় আছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাচারবিরোধী লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বা ব্যাংক হিসাবের নজরদারিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ, কাস্টমস ও কর তথ্যের সঙ্গে ব্যাংকিং তথ্যের সমন্বয়, প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং দ্রুত সম্পদ জব্দ করার পাশাপাশি দেশে বিনিয়োগ পরিবেশও উন্নত করতে হবে। অবৈধ পথে অর্থ বিদেশে নেওয়া যত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে, দেশে সম্পদ ধরে রাখার প্রণোদনা ততই বাড়বে। আর দেশে উদ্যোক্তা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারলে, নীতির ধারাবাহিকতা পেলে এবং ন্যায্য মুনাফা আশা করতে পারলে দেশীয় সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে ফিরে আসার সুযোগ বাড়বে।

