বাংলাদেশে ঋণের সুদের হার ধীরে ধীরে কমলেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদায় প্রত্যাশিত গতি ফিরছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু ঋণের খরচ কমলেই নতুন বিনিয়োগ বাড়বে না। এর জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ভোক্তা চাহিদার উন্নতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতির চাপ কিছুটা কমাতে আগস্ট থেকে নীতিগত সুদের হার ০.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব এখনো স্পষ্ট হয়নি। কারণ এর আগেই কয়েক মাস ধরে ঋণের সুদের হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমানতের গড় সুদের হার বেড়ে ৬.৪২ শতাংশ এবং ঋণের গড় সুদের হার ১২.১৬ শতাংশে উঠেছিল, যা অন্তত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। এরপর ধীরে ধীরে তা কমেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৬.২১ শতাংশ এবং ঋণের হার ১১.৮১ শতাংশ।
এদিকে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদ এবং কলমানি বাজারের হারও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এর পরও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল রয়ে গেছে। চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪.৪৭ শতাংশে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৪.৬২ শতাংশ হলেও তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ৬.৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, শুধু সুদের হার কমানো দিয়ে বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য ব্যবসায়ীদের আস্থা এবং প্রকল্পের লাভজনকতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, কাগজে কম সুদের ঋণ আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবে উচ্চ উৎপাদন খরচ, দুর্বল বাজার চাহিদা এবং কম লাভের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতাও ব্যবসায়িক আস্থাকে দুর্বল করছে।
নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান আসিফ ইব্রাহিমও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ব্যবসায়ীরা শুধু সুদের হার নয়, ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ, জ্বালানি খরচ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি বিবেচনা করছেন।
অনেক উদ্যোক্তা আশঙ্কা করছেন, এখন নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা ও আয় দিয়ে ঋণের খরচ সামলানো সম্ভব হবে কি না।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, সুদের হার কমে যাওয়া অনেক সময় ঋণের চাহিদা দুর্বল হওয়ারও ইঙ্গিত হতে পারে।
তার মতে, ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে আগ্রহী না হলে ব্যাংকগুলোও আমানত সংগ্রহে আগ্রাসী প্রতিযোগিতায় যায় না। ফলে সুদের হার কমলেও তা সবসময় নতুন বিনিয়োগ তৈরি করে না।
তিনি বলেন, কম ঋণ খরচ বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘদিন বিনিয়োগ কম থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে।
তার মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু সস্তা ঋণ নয়, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক দীন ইসলাম বলেন, ঋণ প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা মূলত ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ মনোভাবের প্রতিফলন।
তার মতে, উদ্যোক্তারা যদি বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে সুদের হার কমলেও বড় ধরনের নতুন শিল্প সম্প্রসারণ নাও হতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কর্টল্যান্ডের অর্থনীতির অধ্যাপক বিরূপাক্ষ পাল বলেন, ব্যবসায়ীরা এখনো ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছেন। কারণ একদিকে ঋণের খরচ এখনো তুলনামূলক বেশি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে অপেক্ষা করছে।
তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত স্পষ্টতা না এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না।
ঢাকা চেম্বারের তাসকিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন বিনিয়োগ স্থগিত থাকলে ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।তার মতে, শুধু ঋণের সুদ কমানো নয়, ব্যবসার সামগ্রিক খরচ কমানো এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, রপ্তানি দুর্বল হওয়া, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমেছে।বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংকট—কর বৃদ্ধি, করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা—বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমেছে।
এর ফলে অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যারা আগে ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চলত, এখন ৪০ শতাংশ বা তারও কম সক্ষমতায় উৎপাদন করছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা অনেক ক্ষেত্রে ঋণের খরচ নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাব।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে তাই শুধু সুদের হার কমানোর নীতি যথেষ্ট নয়। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা তৈরি করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

