বাংলাদেশে ভোক্তা ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসা বিক্রি করে দিতে চাইছে বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এই ব্যবসা কিনে নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের দুই শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। দুই ব্যাংকই আলাদাভাবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট তিন ব্যাংকের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আনুষ্ঠানিক সমঝোতা না হওয়ায় আগ্রহী দুই ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। সূত্র আরও জানায়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে তাঁরা ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড প্রথম জানায় যে তারা বাংলাদেশের খুচরা ব্যাংকিং থেকে সরে যেতে চায়। এই খবর ছড়ানোর পরই দেশীয় কয়েকটি ব্যাংক যোগাযোগ শুরু করে। বর্তমানে অধিগ্রহণের দৌড়ে ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংক বাকিদের চেয়ে এগিয়ে আছে।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশি ব্যাংকের এমন প্রস্থান এবারই প্রথম নয়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি দেশে খুচরা ব্যাংকিং বন্ধের ঘোষণা দেয়। তারও আগে ২০০৫ সালে দেশ ছেড়ে যায় আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডও বিশ্বজুড়ে ব্যবসা পুনর্গঠনের পথে রয়েছে। এর অংশ হিসেবে তারা অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়েতে স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তানজানিয়া ও আইভরি কোস্টে ভোক্তা, ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যাংকিং থেকে সরে এলেও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও করপোরেট ব্যাংকিং চালু রেখেছে। শ্রীলঙ্কায় তারা সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছে।
সূত্র বলছে, দেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা ব্যাংকিংয়ে আমানত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির খুচরা সেবার পরিধি বেশ বড়:
- সেভিংস ও চলতি হিসাব, মেয়াদি আমানত এবং বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব
- প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ডভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড, পাশাপাশি ডেবিট কার্ড
- জামানতবিহীন ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ
- শরিয়াহ নীতিতে চলা ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা, যার আওতায় সুদবিহীন ডিপিএস, চলতি হিসাব ও ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড রয়েছে
- প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ সেবা, যার মাধ্যমে তাঁরা দেশে সঞ্চয় করতে এবং সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন
কেন এত আগ্রহ দুই ব্যাংকের? দুই ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে কম খরচের আমানতগুলোর একটি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা শাখায় আছে। অর্থাৎ এসব আমানতের জন্য ব্যাংকটিকে তুলনামূলক কম সুদ দিতে হয়। এই ব্যবসা হাতে এলে কেনার পক্ষের ব্যাংকের সুনাম বাড়বে এবং আর্থিক সূচকেও বড় উন্নতি হতে পারে।
সিটি ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানত এখন প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যক্তিগত, গাড়ি ও গৃহঋণসহ ভোক্তা ঋণের স্থিতি ১২ হাজার কোটি টাকা। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা ব্যবসা যুক্ত হলে সিটি ব্যাংকের ঋণ স্থিতি একলাফে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
সিটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বিক্রির পরিকল্পনার কথা জানার পরই তাঁরা আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, অ্যামেক্স কার্ড চালু করে ব্যাংকটি আগেও ভালো সাড়া পেয়েছে। তবে বিভিন্ন ধাপের অনুমোদন পেরিয়েই এগোতে হবে। পুরো অধিগ্রহণ সম্পন্ন হতে সময়ও লাগবে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যক্তিগত আমানত প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট আমানত এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ভোক্তা ঋণের স্থিতি প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে এ পর্যন্ত একটি প্রাথমিক বৈঠক হয়েছে, চূড়ান্ত কিছু ঠিক হয়নি। কেনার আগে ব্যবসার মূল্য নির্ধারণসহ বেশ কিছু ধাপ শেষ করতে হবে, যা বেশ জটিল।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড ও মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী লিখিত জবাব দেন। তিনি বলেন, বাজারে ছড়ানো গুঞ্জন বা অনুমান নিয়ে তাঁরা কোনো মন্তব্য করেন না। তাঁর ভাষ্য, ব্যাংকটির বৈশ্বিক গ্রুপ নিজেদের ব্যবসা মডেল নিয়মিত যাচাই করে। যেখানে গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ আছে, সেখানে প্রয়োজনে সম্পদ ও মনোযোগ একত্র করার পদক্ষেপ নেয় গ্রুপটি। তিনি আরও বলেন, ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কাজ করছে ব্যাংকটি এবং দেশের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি অটুট।
প্রথমত, এই লেনদেন সম্পন্ন হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বড় হাতবদল ঘটবে। কম খরচের আমানত ও ভালো মানের ঋণ পোর্টফোলিও পাওয়ায় যে ব্যাংক কিনবে, তার মুনাফার সক্ষমতা বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, গ্রাহকদের দিক থেকে কার্ড, ঋণ ও আমানতের শর্ত, সুদহার এবং সেবার মানে পরিবর্তন আসতে পারে। অধিগ্রহণের সময় সাধারণত হিসাব ও কার্ড নতুন ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়। তাই গ্রাহকদের সরকারি নির্দেশনা ও ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখা দরকার।
তৃতীয়ত, এইচএসবিসির পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের খুচরা বাজারে বিদেশি ব্যাংকের ভূমিকা কমে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো এখন ছোট বাজারের ভোক্তা ব্যবসা ছেড়ে নিজেদের শক্তিশালী খাত, যেমন করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দিচ্ছে।
সবশেষে, দরদাম, মূল্য নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসহ অনেক ধাপ বাকি। তাই চূড়ান্ত ফল কী দাঁড়াবে এবং কোন ব্যাংক এগিয়ে যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

