বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে কর্মসংস্থানের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত দুই বছরেরও কম সময়ে এই খাতে প্রায় ৬ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর ওপর, যেখানে পুনর্গঠন, তারল্য সংকট, ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম বৃদ্ধির কারণে কর্মীর সংখ্যা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে মোট কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৭৬৫ জন। ২০২৪ সালের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ৬১৪ জন। অর্থাৎ দুই বছরেরও কম সময়ে খাতটিতে কর্মী কমেছে প্রায় ৫ হাজার ৮৪৯ জন।
কর্মসংস্থান কমার এই ধারা নতুন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে কর্মীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। শুধু ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই আগের মাসের তুলনায় কর্মী সংখ্যা কমেছে ১ দশমিক ০২ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।
তবে কর্মী কমার প্রভাব সব ধরনের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমে সমানভাবে পড়েনি। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কর্মীর সংখ্যা নেমে এসেছে ৪২ হাজার ১১৫ জনে। এক বছরের ব্যবধানে এখানে ৩ হাজারের বেশি কর্মী কমেছে।
অন্যদিকে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর পরিচালিত ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোতে কর্মীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসব কার্যক্রমে কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৩১ জনে, যা এক বছর আগে ছিল ১ হাজার ৫৯০ জন। অর্থাৎ এই সময়ে কর্মী বেড়েছে ৩৪১ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী একীভূত হওয়া ব্যাংকের কর্মীদের তিন বছরের মধ্যে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। তবে কর্মীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য চালু করা মূল্যায়ন পরীক্ষার কারণে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক অস্থিরতা, তারল্য সংকট এবং ব্যবস্থাপনার নানা চ্যালেঞ্জ ইসলামী ব্যাংকগুলোর কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কারণে কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে পাঁচটি ব্যাংককে ঘিরে। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক আর্থিক দুর্বলতা ও তারল্য সংকটের কারণে একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই পাঁচ ব্যাংকে তখন প্রায় ১৬ হাজার কর্মী কর্মরত ছিলেন। একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কর্মীদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে এই প্রক্রিয়ার পর চাকরি হারানোর বিষয়টি কর্মীদের মধ্যে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের মার্চে ওই পাঁচ ব্যাংকের সাবেক কর্মীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করেন। তারা দাবি করেন, প্রায় ১০ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের কর্মসংস্থান পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা প্রতিফলিত হয়নি।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কর্মী কমার পেছনে শুধু ব্যাংক পুনর্গঠন নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ডিজিটাল সেবা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে অনেক প্রশাসনিক ও পরিচালনামূলক কাজে আগের তুলনায় কম জনবল প্রয়োজন হচ্ছে।
তবে একই সময়ে প্রচলিত ব্যাংকগুলো যখন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ করছে, তখন তাদের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমে কর্মী নিয়োগও বাড়ছে। ফলে পুরো খাতের পরিবর্তনকে শুধু চাকরি কমার দৃষ্টিতে না দেখে ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অন্যান্য সূচকেও মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকায়। একই সময়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
তবে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। জুলাই মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় কমে ৬৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। একইভাবে আমদানি পরিশোধ কমে হয়েছে ৯৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যেখানে আগের বছর ছিল ১১৮ কোটি ডলার।
ইসলামী ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী আয়ও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। জুলাই মাসে এই মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৫৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে আগের মাসের তুলনায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর পরিচালিত এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমেও কিছুটা চাপ দেখা গেছে। এ খাতের আমানত আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে, যা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু অংশে চলমান চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে ইসলামী ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি পরিবর্তনের সময় পার করছে। একদিকে প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যাংক একীভূতকরণ এবং কাঠামোগত সংস্কার কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে আমানত ও বিনিয়োগের মতো কিছু সূচকে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। আগামী দিনে এই খাতের স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করবে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সফল বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখার ওপর।

