দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য টিকসই ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম বাড়ি তৈরির ঋণসুবিধা বাড়াতে ১০ কোটি ডলারের সহজ শর্তের ঋণ অনুমোদন দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। এই অর্থায়নের একটি বড় লক্ষ্য হলো নারীদের এই ঋণসুবিধার আওতায় বেশি সংখ্যায় নিয়ে আসা।
এই তহবিল ব্যবহৃত হবে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায়, যেখানে মূল মাধ্যম হবে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন ও দেশের যোগ্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানসমূহ। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাধারণ পরিবারগুলো পাবে দীর্ঘমেয়াদি এবং জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্রঋণ, যা দিয়ে তারা নতুন বাড়ি তৈরি, পুরোনো ঘর মেরামত বা সংস্কারের কাজ করতে পারবে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব সমস্যা—দেশে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের বড় ঘাটতি রয়েছে, আর যাঁরা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে আয় করেন, তাঁদের জন্য প্রচলিত ব্যাংক থেকে বাড়ি তৈরির ঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ সাধারণ বন্ধকি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এই শ্রেণির মানুষকে ঋণ দিতে অনেকটাই অনিচ্ছুক।
এ প্রসঙ্গে এডিবির বাংলাদেশ কার্যালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, একটি পরিবারের মর্যাদা, সুযোগ এবং যেকোনো ধাক্কা মোকাবিলার ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি হয় নিরাপদ আবাসন থেকেই। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ ও দুর্যোগসহনশীল ঘরে বিনিয়োগে সহায়তা করে এই প্রকল্প দেশের দারিদ্র্য কমানো, সামাজিক সুরক্ষা মজবুত করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে অবদান রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার পরিবারকে এই ঋণসুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩২ হাজার ঋণগ্রহীতা হবেন নারী, এবং প্রায় ২৪ হাজার মানুষ থাকবেন যাঁরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বসবাস করেন।
শুধু অর্থ বিতরণেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকল্পটি মানুষকে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জমি-সম্পত্তি সংক্রান্ত জ্ঞান এবং আবাসনের অধিকার নিয়েও সচেতন করবে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে নারীদের আবাসন নিরাপত্তার বিষয়টিতে—এ জন্য ঋণগ্রহীতা দম্পতিদের বসবাসের ব্যবস্থা যথাযথভাবে লিখিত নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে এবং দেশজুড়ে আবাসন খাতে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপ্তি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে প্রকল্পে নির্মাণ ও নকশার ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সুরক্ষামূলক নিয়মও যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে তৈরি হওয়া বাড়িগুলো বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তীব্র তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখেও তুলনামূলক বেশি টিকে থাকতে পারবে।
এই প্রকল্পের একটি বড় দিক হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। উন্নত তথ্যব্যবস্থা, দুর্যোগঝুঁকি যাচাইয়ের পদ্ধতি, ঋণের পোর্টফোলিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল প্রতিবেদনের মাধ্যমে পিকেএসএফ ও সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে। এতে দেশের সামগ্রিক আবাসন অর্থায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগও আকৃষ্ট হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
অর্থায়নের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ১০ কোটি ডলারের মধ্যে ৪ কোটি ডলার আসছে এডিবির জলবায়ু অভিযোজনবিষয়ক তহবিল থেকে, যা প্রকল্পের দুর্যোগসহনশীলতার দিকটিকে আরও জোরদার করে। এর বাইরে কারিগরি সহায়তা হিসেবে আলাদাভাবে আরও ছয় লাখ ডলার অনুদান দেওয়া হচ্ছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে ব্যয় হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তাকারী প্রধান বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর একটি। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ৬৯টি দেশ, যার মধ্যে ৫০টিই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের। সদস্য দেশ ও অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে সংস্থাটি উদ্ভাবনী আর্থিক সমাধান ও কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।

