নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে পারলে কর ফাঁকির সুযোগ অনেকটা কমবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তাঁর দাবি, বাংলা কিউআর পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আদায় সম্ভব। রিকশাচালক থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সবার লেনদেন ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।
আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ওয়ান ব্যাংক আয়োজিত বাংলা কিউআর কোড চালুর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এ কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, বর্তমানে ভ্যাট ও আয়কর থেকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে। কিন্তু নগদ লেনদেনের প্রবণতার কারণে কর ফাঁকির সুযোগ থেকে যাচ্ছে। পণ্য বা সেবা কেনাবেচায় অনেকেই কার্ড বা ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা নিতে আগ্রহী নন। বাংলা কিউআর চালু ও এর ব্যবহার বাড়ানো গেলে এই চিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বাংলা কিউআরের পরিধি বাড়ানোর কাজ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত সবাইকে ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনার লক্ষ্য আছে।
গভর্নর আরও বলেন, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির (পিটুপি) লেনদেনেও কিউআর কোড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ফলে রিকশাভাড়া বা ছোট অঙ্কের কেনাকাটার মতো দৈনন্দিন লেনদেনও সহজে ডিজিটাল মাধ্যমে করা যাবে। তাঁর মতে, ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। এসব ব্যবস্থার সমন্বিত বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
গভর্নরের এই বক্তব্যের যুক্তি বোঝা সহজ। নগদ লেনদেনের কোনো স্থায়ী ডিজিটাল চিহ্ন থাকে না। ফলে কত বিক্রি হলো, কত আয় হলো, তা যাচাই করা কর কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন। ডিজিটাল লেনদেনে প্রতিটি পেমেন্টের রেকর্ড থেকে যায়। এতে বিক্রির প্রকৃত পরিমাণ জানা যায় এবং ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকির সুযোগ কমে। একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড দেখিয়ে ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ পাওয়ার সুযোগও পেতে পারেন।
তবে ২ লাখ কোটি টাকার হিসাবটি নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। এই অঙ্ক কোন পদ্ধতিতে বের করা হয়েছে, তা গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্ট নয়। ফলে এটিকে এখনই নিশ্চিত প্রাপ্তি না ধরে সম্ভাবনা হিসেবে দেখা ভালো। কারণ, কিউআর কোড চালু হলেই সব লেনদেন ডিজিটাল হয়ে যাবে না। অনেক ছোট ব্যবসায়ী ও ক্রেতা এখনো নগদে অভ্যস্ত। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ সবার কাছে সমানভাবে নেই। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন এড়ানোর একটি কারণ হতে পারে, এতে আয় প্রকাশ পেয়ে কর দেওয়ার চাপ বাড়বে। এই মনোভাব বদলানো কেবল প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য আস্থা ও প্রণোদনা দরকার।
আরেকটি বিষয় হলো, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য যে কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কীভাবে ভাগ করা হবে এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। গভর্নর তথ্য আদান-প্রদানের প্রসঙ্গ তুলেছেন, তবে বিস্তারিত বলেননি। রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে কত দ্রুত ও কত ব্যাপকভাবে ব্যবস্থাটি ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ কতটা সহজে তা ব্যবহার করতে পারেন, তার ওপর।
আপাতত নজর থাকবে বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণের সময়সীমা, ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কতটা বাড়ে, সেদিকে।

