বাংলাদেশের বন্ড বাজার ধীরে ধীরে বাড়লেও এখনো সম্ভাবনার তুলনায় অনেক ছোট। বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি, বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান, নিরীক্ষক ও ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থার জবাবদিহির অভাবকে বাজার বিকাশের বড় বাধা হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
দ্য ডেইলি স্টারের আয়োজিত ‘আনলকিং বাংলাদেশ’স বন্ড মার্কেট: অপরচুনিটিজ, চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক আলোচনায় ব্যাংকার ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বন্ড বাজারকে টেকসই করতে হলে তারল্য বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বন্ড কেনাবেচা সহজ করা প্রয়োজন।
ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী তানজিম আলমগীর বলেন, বন্ড বাজারের বড় সমস্যা হলো তারল্য সংকট। বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আশায় বন্ড কিনলেও প্রয়োজনের সময় সহজে বিক্রি করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ হারান।
তার মতে, বন্ড শুধু ব্যাংক ঋণ পরিশোধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। ভালো মানের প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়নের জন্য বন্ড বাজারকে ব্যবহার করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর বড় শাখা নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা ব্যবহার করে বন্ড বিনিয়োগ আরও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, বন্ডের সহজ লেনদেন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ বিষয়ে কাজ করছে এবং বন্ড তালিকাভুক্তির শর্ত আরোপ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, বন্ড তালিকাভুক্তির ফি ৮০ শতাংশ কমিয়েছে ডিএসই।
বন্ড বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় উঠে আসে। মিউচুয়াল ফান্ড ও পেনশন ফান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।
বিআরএসি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান নাজমুল আহসান বলেন, ব্যাংকের দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক থাকলেও বর্তমান নিয়মের কারণে ব্যাংকগুলো সম্পদ ব্যবস্থাপনা সেবা দিতে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।
তার মতে, ব্যাংকগুলোকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা সেবা দেওয়ার সুযোগ দিলে গ্রাহকদের শেয়ার, বন্ড, সুকুক, মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য বিনিয়োগ সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া সহজ হবে।
আলোচনায় বক্তারা বন্ড বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্ভরযোগ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও মানসম্পন্ন ঋণমান নির্ধারণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন।
ডিএসইর নুজহাত আনোয়ার বলেন, বিনিয়োগকারীরা যাতে নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও ঋণমান মূল্যায়নের ওপর আস্থা রাখতে পারেন, সে জন্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মান উন্নত করতে হবে।
তানজিম আলমগীর বলেন, ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু নিয়ম পূরণের জন্য ঋণমান দেওয়া হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হবে না।
বাংলাদেশের বন্ড বাজার এখনো আকারে ছোট। দেশের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত মাত্র ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় কম।
আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নির্দিষ্ট আয়ভিত্তিক বাজারে সরকারি বন্ডের আধিপত্য রয়েছে। তালিকাভুক্ত সরকারি বন্ডের সংখ্যা ২১৭টি, যার বাজার মূলধন প্রায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে করপোরেট বন্ডের বাজার তুলনামূলক ছোট। তালিকাভুক্ত করপোরেট বন্ডের সংখ্যা মাত্র ১৬টি এবং মোট বাজার মূলধন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
বক্তারা সুকুক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বন্ড বিনিয়োগ সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যাতে সহজে বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে, সে ধরনের ব্যবস্থা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী বন্ড বাজার তৈরি হলে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নতুন উৎস তৈরি হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা।

