দেশে প্রথমবারের মতো ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিস্তার ও ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারের প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশনা এল। নীতিমালা অনুযায়ী, শরিয়াহসম্মত এই কার্ড দিয়ে মদ, জুয়া, শূকর প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা সুদভিত্তিক সেবার মতো নিষিদ্ধ খাতে লেনদেন করা যাবে না। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড গাইডলাইন্স’ জারি করে। এর ফলে ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামী শাখাও নির্দিষ্ট মডেলের আওতায় শরিয়াহসম্মত ক্রেডিট কার্ড সেবা দিতে পারবে। এতদিন এ বিষয়ে কোনো কেন্দ্রীয় গাইডলাইন না থাকায় ইসলামী ব্যাংকগুলো এই খাতে বড় পরিসরে এগোতে পারেনি।
নীতিমালায় ইসলামী কার্ড পরিচালনার তিনটি মৌলিক নীতি স্পষ্ট করা হয়েছে। সুদ বা রিবা, জুয়া বা মাইসির এবং অনিশ্চয়তা বা গারার—এই তিনটি বিষয় সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। লেনদেন শরিয়াহসম্মত রাখতে ব্যাংকগুলোকে দুটি আলাদা মডেলের যেকোনো একটি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
প্রথম মডেলটি হলো করজে হাসানা ও উজরাহ। এটি মূলত জামানতবিহীন কার্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এই মডেলে মার্চেন্ট পেমেন্ট ও নগদ অর্থ উত্তোলনকে সুদমুক্ত ঋণ, অর্থাৎ করজে হাসানা হিসেবে গণ্য করা হবে। গ্রাহককে শুধু মূল অর্থ ফেরত দিতে হবে। ব্যাংক এই ঋণের ওপর কোনো সুদ বা মুনাফা দাবি করতে পারবে না।
তবে কার্ড ইস্যু, অ্যাকাউন্ট পরিচালনা ও নেটওয়ার্ক সেবার বিপরীতে ব্যাংক ‘ক্যাটাগরি-বি উজরাহ’ বা সার্ভিস ফি নিতে পারবে। এই ফি ব্যাংকের প্রকৃত প্রত্যক্ষ খরচের বেশি হতে পারবে না। এতে কোনো মুনাফা যুক্ত করা যাবে না। বকেয়া ঋণ, সময়সীমা বা বিলম্বে পরিশোধের ভিত্তিতে ফি বাড়ানো-কমানোও নিষিদ্ধ।
দ্বিতীয় মডেলটি কাভার্ড বা ক্যাশ-কোলাটেরালাইজড কার্ড। নগদ আমানত বা অন্য কোনো জামানতের বিপরীতে এই কার্ড দেওয়া যাবে। এখানে নির্ধারিত কভার থেকেই লেনদেনের অর্থ মেটানো হয়। ফলে করজে হাসানা তৈরি হয় না। এ কারণে ব্যাংক ‘ক্যাটাগরি-এ’ সার্ভিস ফি নির্ধারণ করতে পারবে, যার মধ্যে মুনাফার অংশ থাকতে পারে। তবে ফি হতে হবে কার্ডের ধরন অনুযায়ী। ঋণের সীমা বা আমানতের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তা বদলানো যাবে না।
শরিয়াহবহির্ভূত লেনদেন ঠেকাতে ব্যাংকগুলোকে স্বয়ংক্রিয় ‘মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড’ (এমসিসি) ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এর মাধ্যমে মদ বিক্রির প্রতিষ্ঠান, জুয়ার প্রতিষ্ঠান, প্রচলিত বিমা, শূকর প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সুদভিত্তিক আর্থিক সেবার মতো খাতে লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে।
প্রতিটি ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি নিষিদ্ধ এমসিসির তালিকা অনুমোদন করবে। কমিটি এর বাস্তবায়নও নিয়মিত তদারকি করবে। পাশাপাশি বছরে অন্তত একবার শরিয়াহ অডিটের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকর, তা যাচাই করতে হবে।
বিলম্ব ফির ক্ষেত্রেও আলাদা নিয়ম রাখা হয়েছে। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিলম্বজনিত চার্জ ব্যাংকের আয় হিসেবে দেখানো যাবে না। তবে আর্থিকভাবে সক্ষম কোনো গ্রাহক ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না করলে তাঁকে নিরুৎসাহিত করতে নির্দিষ্ট অঙ্কের বিলম্ব ফি নেওয়া যাবে। এই অর্থ নেওয়া হবে চুক্তির আগে করা দানের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকের মূল আয়ে যোগ হবে না। এটি আলাদা দাতব্য হিসাবে জমা রাখতে হবে। শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত দাতব্য কাজে তা ব্যয় করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টের (আইবিআরপিডি) পরিচালক আনিসুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও শরিয়াহভিত্তিক ক্রেডিট কার্ডের কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন ছিল না। এ কারণে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো ইসলামী ব্যাংকগুলো এ খাতে বিস্তৃতভাবে এগোতে পারেনি। তিনি আরও জানান, ইসলামী ব্যাংকিংকে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিতে ইসলামী ব্যাংক আইন এবং ইসলামী ব্যাংকিং পণ্যের আলাদা গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে।
উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার কোনো কেন্দ্রীয় গাইডলাইন ছিল না। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত ইতিবাচক।
নিজের ব্যাংকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, শরিয়াহ নীতিমালা মেনে তাঁদের ব্যাংকে ‘খিদমাহ’ নামে একটি ক্রেডিট কার্ড চালু আছে। গ্রাহকদের কাছে এর চাহিদা বেশ ভালো। তবে কার্ডটি উজরাহ মডেলে চলায় শুধু প্রসেসিং ও সার্ভিস ফি নেওয়া যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় বেশি পড়ে।
এই নীতিমালার গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট। প্রথমত, এতদিন ইসলামী ব্যাংকগুলো নিজ নিজ উদ্যোগে শরিয়াহসম্মত কার্ড চালু করলেও তাদের জন্য অভিন্ন কোনো কাঠামো ছিল না। এখন সব ব্যাংক একই নিয়মের আওতায় আসবে। এতে গ্রাহকের আস্থা বাড়বে বলে আশা করা যায়। ধর্মীয় কারণে যাঁরা এতদিন ক্রেডিট কার্ড এড়িয়ে চলতেন, তাঁদের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখাগুলোও এখন এই বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। গ্রাহক তুলনামূলক বেশি পণ্য ও সেবা থেকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। উজরাহ মডেলে ফি সীমিত থাকায় আয়ের সুযোগ কম। জামাল উদ্দিন মজুমদারের বক্তব্যেও ব্যয়ের চাপের কথা এসেছে। ফলে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়িকভাবে কতটা আগ্রহী হয়, তা দেখার বিষয়। কাভার্ড কার্ডে মুনাফার অংশ রাখার সুযোগ থাকায় অনেক ব্যাংক সেদিকে ঝুঁকতে পারে।
চতুর্থত, স্বয়ংক্রিয় এমসিসি ফিল্টারিংয়ের কার্যকর বাস্তবায়ন বড় পরীক্ষা। প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, নিয়মিত তদারকি ও বার্ষিক শরিয়াহ অডিট ঠিকমতো না হলে নীতিমালার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। গ্রাহকদেরও এসব নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি, যাতে বিদেশি ওয়েবসাইটে কেনাকাটার সময় অহেতুক লেনদেন প্রত্যাখ্যানের বিড়ম্বনা না হয়।
সব মিলিয়ে নীতিমালাটি দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল আর্থিক সেবার নতুন দরজা খুলে দিল। এখন দেখার বিষয়, ব্যাংকগুলো কত দ্রুত ও কতটা স্বচ্ছভাবে এই সেবা গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারে।

