দেশে প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বুধবার বিকাল ৩টায় এক সংবাদ সম্মেলনে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের এই নীতি প্রকাশ করা হবে। এর মধ্য দিয়ে ছয় মাস মেয়াদি মুদ্রানীতির প্রচলিত পদ্ধতি বদলে নতুন ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, দ্রুত বদলাতে থাকা দেশি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মুদ্রানীতিকে আরও কার্যকরভাবে মেলানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। নতুন ব্যবস্থায় মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী নীতিগত অবস্থান সমন্বয় করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজারের পরিস্থিতি নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগও বাড়বে।
মুদ্রানীতি ঘোষণার কাঠামো এর আগে কয়েক দফায় বদলেছে। শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করত। পরে চালু হয় ছয় মাস মেয়াদি কাঠামো। এবার সেটি আরও ছোট করে তিন মাসে নামিয়ে আনা হলো।
এই পরিবর্তনের পেছনে বাইরের পরামর্শও কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি প্রণয়নের সুপারিশ করেছিল। এ ছাড়া চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নীতি প্যানেলও প্রতি তিন মাসে মুদ্রানীতি বিবৃতি প্রকাশের কথা বলেছিল। প্যানেলের মতে, এতে মুদ্রানীতির সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়বে।
নতুন মুদ্রানীতি এমন এক সময়ে আসছে, যখন মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি টানা তৃতীয় মাসের মতো কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। গত ১০ মাসের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। এর আগে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। অর্থাৎ তিন মাসে মূল্যস্ফীতি এক শতাংশের বেশি কমেছে।
নীতি সুদহারের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছিল। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করে। ছয় বছরের মধ্যে এই প্রথম নীতি সুদহার কমানো হয়েছে।
জুলাইয়ের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশে এবং ২০২৭ সালের জুনে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নামবে। তবে দুটি পূর্বাভাসই সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে কাল ঘোষিতব্য মুদ্রানীতিকে ঘিরে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বেশি থাকবে। বিশেষ করে নীতি সুদহার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী অবস্থান নেয়, সেদিকে নজর থাকবে সবার।
মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা কিছুটা জায়গা তৈরি করলেও সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত সহজ হবে না। একদিকে উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসার খরচ বাড়ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। ফলে সুদহার আরও কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আবার কঠোর অবস্থানে থাকলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি চাপে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই দুই দিকের ভারসাম্য রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ।
ত্রৈমাসিক ব্যবস্থার একটি সুবিধা হলো, প্রতি তিন মাসে পরিস্থিতি যাচাই করে দ্রুত নীতি বদলানো যাবে। ফলে একবারের সিদ্ধান্তে ভুল হলেও তা শোধরানোর সুযোগ থাকবে। তবে এতে বাজারে নীতিগত অনিশ্চয়তা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলালে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে দ্বিধায় পড়তে পারেন। তাই নীতির ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে নতুন এই ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি পরীক্ষাও। কাল ঘোষিত মুদ্রানীতি থেকেই বোঝা যাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি ফেরানোর মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য টানতে চায়।

