বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এখন সাধারণ মানুষের আস্থার ব্যাংকে পরিণত হওয়ার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা এই ব্যাংকটির বর্তমান লক্ষ্য হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদের একটি সম্পূর্ণ টেকসই এবং নগদবিহীন বা ক্যাশলেস আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা।
সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন এই রূপান্তরের পেছনের কৌশল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে একটি ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি শুধু আর্থিক ব্যালান্স শিটে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা সুশাসন এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার সক্ষমতার ওপরই সেই দীর্ঘমেয়াদি আস্থা গড়ে ওঠে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অন্যতম প্রধান সমস্যা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কমিউনিটি ব্যাংক এক অভিনব ও প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণ করেছে।
প্রথম আলোর ওই সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন জানান যে তারা ঋণখেলাপি হওয়ার পর আইনি পদক্ষেপ বা অর্থ আদায়ের পেছনে ছোটার বদলে আগাম সতর্কতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। নিয়মিত নজরদারি কঠোর জবাবদিহি এবং গ্রাহকের সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তারা সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সুশাসনের এই নীতির কারণেই ব্যাংকটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কৃষক এবং নারীসহ ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে অত্যন্ত নিরাপদে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হচ্ছে।
ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ ও প্রযুক্তি নির্ভর করতে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অ্যাপ কমিউনিটি ক্যাশ একটি বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেন পুরোপুরি ক্যাশলেস করার উদ্দেশ্যে এই অ্যাপে বাংলা কিউআর কোড দিয়ে মার্চেন্ট পেমেন্টের পাশাপাশি কার্ড বা চেক ছাড়াই শাখা থেকে কিউআর স্ক্যান করে নগদ উত্তোলনের অত্যাধুনিক সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে ব্যাংকটির মোট লেনদেনের প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশই সম্পন্ন হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে এবং তাদের পঁচাশি শতাংশ গ্রাহক এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছেন। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকটি প্রতিরোধ সুরক্ষা নিয়মিত পরীক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মতো চার স্তরের একটি শক্তিশালী নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক পেরোল ব্যাংকিং কমিউনিটি ব্যাংকের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি হলেও তারা এখন শুধু নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। পেরোলের এই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সাধারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বা এসএমই এবং রিটেইল খাতে নিজেদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের কৌশল হাতে নিয়েছে। এসএমই খাতে ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করার পাশাপাশি প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছাতে উপশাখা এবং সার্ভিস বুথ ব্যাংকিংয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে সাধারণ গ্রাহকদের এখন আর ছোটখাটো কাজের জন্য দূরের কোনো শাখায় গিয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না বরং হিসাব খোলা থেকে শুরু করে রেমিট্যান্স গ্রহণ বা ঋণ আবেদনের মতো কাজগুলো স্থানীয় পর্যায়েই দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও কমিউনিটি ব্যাংক একে নতুন সম্ভাবনার চোখেই দেখছে। প্রথম আলোর কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারের শেষাংশে মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন জানান যে আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বিশ্বস্ত টেকসই ও সম্পূর্ণ ক্যাশলেস ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তাদের পরিচালনা পর্ষদ।
স্বচ্ছতা প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন এই তিনটি মূল ভিত্তিকে সামনে রেখে তারা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে নিজেদের সেবার মান উন্নয়নে কাজে লাগাতে চান। সব মিলিয়ে সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় অত্যাধুনিক আর্থিক সেবা পৌঁছে দিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করার পথেই হাঁটছে কমিউনিটি ব্যাংক।

