ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের চাপ কমিয়ে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে ঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে থাকায় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা চালানো ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় স্বল্প সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি ও কৃষি খাতে ঋণ সহজ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
গভর্নর গত শুক্রবার রাজশাহী নগরের ভেড়িপাড়ার মোড়ে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) মিলনায়তনে এসব কথা বলেন। বেসরকারি খাতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন।
সভায় ব্যবসায়ী, চেম্বার নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যাংক কর্মকর্তারা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার।
গভর্নরের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সুদহারের প্রসঙ্গ। ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলে লাভের বড় অংশ চলে যায় ঋণের কিস্তিতে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই চাপ আরও তীব্র। কারণ, তাঁদের হাতে নগদ অর্থের জোগান কম এবং বিকল্প অর্থায়নের সুযোগও সীমিত। ফলে নতুন বিনিয়োগ থমকে যায়, কর্মসংস্থানও কমে। প্রণোদনা প্যাকেজের মূল লক্ষ্য এই চক্র ভাঙা।
তরুণদের জন্য আলাদা একটি উদ্যোগের কথাও জানান গভর্নর। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে যে উৎসাহ ও অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগাতে ‘উদ্যোগ’ নামে একটি স্কিমের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে উদ্যোক্তা বাছাই করা হবে। সব মিলিয়ে ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। স্কিমটি এখন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। আগামী নভেম্বর থেকে এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।
কৃষি খাতের ঋণ নিয়েও বড় ঘোষণা এসেছে। গভর্নর জানান, ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম রয়েছে। এর আওতায় আরও বেশি প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষককে সুবিধা দিতে জমি বা স্থাবর সম্পত্তির বদলে বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁদের নিজের জমি নেই বা জমির কাগজপত্র জটিল, তাঁরাও ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিকে গতিশীল করতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকার আলাদা একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের কথা উল্লেখ করেন তিনি। গভর্নরের আশা, এই অর্থায়ন শুধু উৎপাদনে নয়, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে আরও কার্যকর করবে।
প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা ইতিবাচক হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে দেখা গেছে, স্বল্প সুদের তহবিল ঘোষণা হলেও ব্যাংকগুলোর কঠিন শর্ত, জামানতের জটিলতা ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে প্রকৃত উদ্যোক্তারা অনেক সময় তা পান না। রাজশাহীর সভাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের একসঙ্গে বসিয়ে মাঠপর্যায়ের বাধাগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ এখানে তৈরি হয়েছে।
বিকল্প জামানতের সুযোগ নিঃসন্দেহে একটি বড় পদক্ষেপ। তবে ব্যাংকগুলো এই সুযোগ কতটা সহজভাবে দেবে, তা দেখার বিষয়। জামানতের শর্ত শিথিল হলে ঋণ ফেরত না আসার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
আরেকটি প্রশ্ন, ১২ থেকে ১৪ শতাংশের সাধারণ সুদহার কমে আসবে কি না। প্রণোদনার স্বল্প সুদের ঋণ নির্দিষ্ট খাত ও গোষ্ঠীর জন্য। বাকি ব্যবসায়ীদের জন্য বাজারের সুদহারই প্রযোজ্য থাকবে। ফলে এই প্যাকেজ উচ্চ সুদের সমস্যার আংশিক সমাধান দিতে পারে, পুরোটা নয়।
‘উদ্যোগ’ স্কিমের ক্ষেত্রেও বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি উপজেলা থেকে মাত্র ১০ জন বাছাই করা হলে প্রতিযোগিতা হবে তীব্র। তাই প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও অর্থায়ন একসঙ্গে দেওয়া গেলে তবেই তরুণেরা টেকসই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারবেন।
সব মিলিয়ে গভর্নরের ঘোষণায় বেসরকারি খাত, কৃষি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আশার বার্তা আছে। এখন অপেক্ষা, নভেম্বরে স্কিম চালুর পর এই প্রতিশ্রুতি কতটা সময়মতো ও সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায়।

