দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে বাড়ছে রেমিট্যান্স, বাড়ছে মানুষের আমানত, ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে জমছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। অন্যদিকে সেই অর্থ ব্যবসা ও শিল্প খাতে ঋণ হিসেবে প্রবাহিত হচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ পৌঁছেছে রেকর্ড পর্যায়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর কাছে এমন বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে, যা নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থের অতিরিক্ত, কিন্তু তা ঋণ হিসেবে বেসরকারি খাতে যাচ্ছে না।
এর আগে জুলাই মাসে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং জুন মাসে ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। গত দেড় বছরে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকায়। এরপর ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ব্যাংকারদের মতে, অতিরিক্ত তারল্যের মূল কারণ হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকে আমানত বাড়া। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকের এই বাড়তি অর্থ ব্যবসা সম্প্রসারণ, শিল্প স্থাপন এবং বিনিয়োগের জন্য ঋণ হিসেবে বাজারে ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আরও ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্স বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের আয় ও সঞ্চয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংক আমানতে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশের ব্যাংক আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
তবে আমানত বাড়লেও ব্যাংকগুলো সেই অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারছে না। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। টানা ষষ্ঠ মাসের মতো এই প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে, যা দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতেও বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের চাপ এবং সরকারের বাড়তে থাকা ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে।
ফলে অনেক ব্যাংক ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করছে। কারণ সরকারি খাতের বিনিয়োগকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর এই সতর্কতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো খেলাপি ঋণের ভয়াবহ বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দেড় বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেছে। বিশেষ করে বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ছোট ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ১৫ শতাংশ।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ২০টি ব্যাংক কার্যত নতুন ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য অনেক ব্যাংক ভালো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ঋণ দেওয়ার আগে কঠোর যাচাই করছে।
তবে শুধু ব্যাংকের অনীহাই নয়, ঋণের চাহিদাও কমেছে। দুর্বল ব্যবসায়িক আস্থা, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
ফলে বর্তমানে ঋণ সংকটের পেছনে দুটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে—একদিকে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার আগ্রহ কমেছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ঋণের চাহিদাও কমেছে।
এদিকে সরকারের ঋণ গ্রহণও ব্যাংকিং খাতে চাপ তৈরি করছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। ঋণ পরিশোধের পর প্রথম দুই মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকের অর্থ দীর্ঘ সময় উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হলে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে। একদিকে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বাড়ছে, মানুষের সঞ্চয় বাড়ছে, ব্যাংকে অর্থের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। অন্যদিকে সেই অর্থ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে পারছে না।
ব্যাংকিং খাতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অতিরিক্ত তারল্যকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করা। না হলে ব্যাংকে জমে থাকা বিপুল অর্থ অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনার পরিবর্তে স্থবিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

