ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায় এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা সম্পদের ব্যবস্থাপনায় নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করছে সরকার। এ জন্য ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি হয়েছে। খসড়ার ওপর ইতিমধ্যে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওনা না মেটালে বিশেষায়িত কোম্পানি বন্ধক রাখা সম্পদ দখল করে বিক্রি করতে পারবে। এমনকি প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও নিতে পারবে তারা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা খেলাপি ঋণ ও দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ দ্রুত উদ্ধার করাই আইনটির মূল লক্ষ্য। তাঁর ভাষ্য, আইনটি কার্যকর হলে এই খাতের জন্য একটি বিশেষায়িত কাঠামো তৈরি হবে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে খেলাপি সম্পদ কিনে নিয়ে তা পুনর্গঠন, দখল, বিক্রি ও সিকিউরিটাইজেশন করতে পারবে।
তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করলেই খেলাপি ঋণের পুরো সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের মতে, খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে জামানতের মূল্য প্রকৃত মূল্যের চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণ কোম্পানির হাতে গেলেও প্রকৃত অর্থ উদ্ধার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
আইনের আওতায় ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ (ডিএএমইউ) নামে একটি পৃথক সংস্থা গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে থাকলেও আইনে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগে স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করবে। এর প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায়। প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক কার্যালয়ও খোলা যাবে।
ডিএএমইউর প্রধান দায়িত্ব হবে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ডিএএমসি) ও লোন সার্ভিসার কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া এবং তাদের তদারকি, পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণ করা। শর্ত ভঙ্গ করলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল এবং প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে সংস্থাটির হাতে। এ ছাড়া দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের নিবন্ধন, শ্রেণিবিন্যাস, অধিগ্রহণ, মূল্যায়ন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করবে এই ইউনিট। আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ডিএএমসি ও যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয় এবং এ ধরনের সম্পদ নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাও এর কাজের অংশ। প্রয়োজনে ডিএএমসি ও লোন সার্ভিসার কোম্পানির কাছ থেকে ব্যবসা ও লেনদেনের তথ্য চাওয়া এবং তাদের ওপর নিরীক্ষা, পরিদর্শন ও তদন্ত চালানোর ক্ষমতাও থাকবে।
ডিএএমইউ পরিচালিত হবে একজন প্রধানের নেতৃত্বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সুপারিশে সরকার তাঁকে নিয়োগ দেবে। পদমর্যাদা ও সুবিধার দিক থেকে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমতুল্য বিবেচিত হবেন। তাঁর মেয়াদ হবে একবারে সর্বোচ্চ তিন বছর। ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স বা দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে তিনি আর পদে থাকতে পারবেন না। খেলাপি সম্পদ উদ্ধারে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্স’ গঠনের ক্ষমতাও ডিএএমইউকে দেওয়া হবে।
ডিএএমসি গঠন করতে হলে কোম্পানিকে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। ডিএএমইউ যে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করবে, তা পুরোটাই নগদে পরিশোধ করতে হবে। কোম্পানির পরিচালক, প্রধান নির্বাহী ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, সম্পদ পুনরুদ্ধার বা আইনি কাজে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাঁদের ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ডও পূরণ করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ হতে হবে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন পরিচালক। লাইসেন্স পাওয়ার পরও প্রয়োজনে ডিএএমইউ এর শর্ত বদলাতে, সংশোধন করতে, স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে। আইন বা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ, অবৈধ অর্থ পাচার কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললেও লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করা যাবে।
ডিএএমসি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মূল্য নির্ধারণের পর চুক্তির মাধ্যমে সরাসরি দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ কিনতে পারবে। তবে কেনার মূল্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি নগদে দিতে হবে। এই অর্থ জোগাড়ে ডিএএমসি দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে পারবে। শেয়ার, বন্ড বা ডিবেঞ্চার ছাড়তে পারবে। যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, বিশেষ বিনিয়োগ কাঠামো বা সিকিউরিটি সার্টিফিকেট ইস্যুর মাধ্যমেও অর্থ তোলা যাবে। অধিগ্রহণ করা সম্পদ সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমেও অর্থায়ন করা সম্ভব হবে।
এই ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই ঋণ কেনে। ১০ টাকার ঋণ ৫ টাকায় কিনলে তার বিপরীতে পর্যাপ্ত ও বাস্তব সম্পদ থাকতে হবে। কিন্তু জামানত না থাকলে কিংবা জামানত অতিমূল্যায়িত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এসব ঋণ কিনতে আগ্রহী নাও হতে পারেন।
তাঁর মতে, বর্তমানে ঘোষিত ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণের বড় অংশই জামানতবিহীন কিংবা অতিমূল্যায়িত জামানতের বিপরীতে দেওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জামানত চার-পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। গত কয়েক বছরে শুধু কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে শত শত, এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঋণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির আওতায় এনে সমাধান করা কঠিন। ফলে খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ এই ব্যবস্থার বাইরেই থেকে যেতে পারে।
মুসলিম চৌধুরী আরও বলেন, ঘোষিত খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশ হলেও প্রকৃত চিত্র আরও বড় হতে পারে। পুনঃতফসিল করা ঋণ খাতায় ভালো দেখানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেখান থেকে টাকা ফেরত আসে না। আদালতে মামলা ও রিট থাকা ঋণও আছে। সব মিলিয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশের বেশি, এমনকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ডিএএমসিকে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনা করে বকেয়া মেটানো যাবে। বন্ধক রাখা সম্পদের দখল নেওয়া, ইজারা দেওয়া বা বিক্রি করে অর্থ আদায় করা যাবে। প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পরিচালনার কর্তৃত্বও নেওয়া যাবে। এর বাইরে কোনো কোম্পানির ঋণের অংশ ইকুইটি শেয়ারে রূপান্তর, তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকবে। তবে মুসলিম চৌধুরীর মতে, শুধু দখলের ক্ষমতা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ঋণ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডিএএমসি ঋণের পরিমাণ, সুদ, মেয়াদ, কিস্তির সময়সূচি ও জামানতের শর্ত বদলাতে পারবে। মেয়াদ বাড়ানো, ঋণের একটি অংশ ইকুইটিতে রূপান্তর, সুদ কমানো বা মওকুফ এবং মূলধনের পরিমাণ কমানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সীমার বেশি সুদ বা মূলধন কমাতে হলে ডিএএমইউর আগাম অনুমোদন লাগবে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে তাঁকে ‘নো-ডিউস সার্টিফিকেট’ দেওয়া যাবে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জামানত ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। বিচারাধীন ঋণের ক্ষেত্রেও সমঝোতা আদালতে জমা দিয়ে ‘সম্মত ডিক্রি’ নেওয়া যাবে।
বন্ধক বা দায়বদ্ধ সম্পদ বিক্রির আগে বাংলাদেশ ব্যাংক-অনুমোদিত মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে। সেই বাজারমূল্যের ভিত্তিতে ডিএএমইউ-নির্ধারিত পদ্ধতিতে ঠিক হবে রিজার্ভ মূল্য। এরপর ঋণগ্রহীতাকে নোটিশ দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে পাওনা পরিশোধ অথবা রিজার্ভ মূল্য মিটিয়ে সম্পদ ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এই সময়ে তা না হলে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিক্রি হতে পারে কোটেশন, প্রকাশ্য টেন্ডার, নিলাম অথবা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে। কোনো ক্ষেত্রেই রিজার্ভ মূল্যের চেয়ে কম দামে সম্পদ বিক্রি করা যাবে না। টেন্ডার বা নিলামের ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। রিজার্ভ মূল্যের চেয়ে বেশি দর না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কমিয়ে নতুন রিজার্ভ মূল্য ঠিক করে আবার বিক্রি করা যাবে।
ঋণগ্রহীতা সম্পদের দখল ছাড়তে না চাইলে ডিএএমসি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা চাইতে পারবে। অনুরোধ পাওয়ার পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা তাঁর মনোনীত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে দখল উদ্ধার করে ডিএএমসির কাছে হস্তান্তর করবেন। দরকার হলে ডিএএমইউর কাছে এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্সের সহায়তাও চাওয়া যাবে।
ডিএএমসি দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ অধিগ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠন করতে পারবে। ট্রাস্টের সম্পদ ডিএএমসি বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ থেকে আলাদা থাকবে এবং তাদের পাওনাদারদের দাবির বাইরে থাকবে। অর্থাৎ সম্পদগুলো ‘ব্যাংকরাপ্সি রিমোট’ হিসেবে সুরক্ষিত থাকবে। খেলাপি ঋণসংক্রান্ত সম্পদের ওপর ট্রাস্টের দাবি ‘ফার্স্ট চার্জ’ ও অগ্রাধিকারমূলক দাবি হিসেবে গণ্য হবে। কর, শুল্ক, ভ্যাট বা অন্যান্য সরকারি রাজস্ব দাবির ওপরও এই অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব আছে। তবে আদালতের চূড়ান্ত বাজেয়াপ্তের আদেশ থাকলে সেই নির্দেশনা মানতে হবে।
ডিএএমসি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাইলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত লোন সার্ভিসার কোম্পানি নিয়োগ দিতে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, সমঝোতা, ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, সম্পদ অনুসন্ধান এবং আইনি কার্যক্রমে সহায়তা করবে। তবে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত নিতে বা ব্যাংকিং ব্যবসা করতে পারবে না। জোরপূর্বক বা বেআইনি পদ্ধতিতে ঋণ আদায়ও নিষিদ্ধ থাকবে। গ্রাহক সুরক্ষা, তথ্যের গোপনীয়তা, ডেটা সুরক্ষা ও ন্যায্য ঋণ আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে আচরণবিধি তৈরি করা হবে।
আইনে খেলাপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিএএমইউ, ডিএএমসি বা লোন সার্ভিসার কোম্পানির মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়াতেও তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, যৌথ উদ্যোগ বা অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা, উদ্যোক্তা, প্রমোটার বা স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও কাজ করা যাবে না। এই বিধান লঙ্ঘন করে হওয়া কোনো লেনদেন বা নিয়োগ শুরু থেকেই বাতিল বলে গণ্য হবে।
দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ এবং এ-সংক্রান্ত সিকিউরিটি সার্টিফিকেট বা আর্থিক উপকরণ কেনাবেচার জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করে ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ও সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। দরকার মনে করলে ডিএএমইউ নিজেই এমন প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে রাখা হয়েছে কঠোর শাস্তির বিধান। লাইসেন্সের শর্ত ভাঙলে ডিএএমসি বা লোন সার্ভিসার কোম্পানির ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। লাইসেন্স নেওয়ার সময় মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে জরিমানা ২০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা। অনুমোদন ছাড়া শাখা বা অফিস খুললে পাঁচ থেকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছে। লাইসেন্স ছাড়া বা লাইসেন্স বাতিলের পর ব্যবসা চালালে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা, কিংবা দুটোই হতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে লাইসেন্স নিলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে।
সম্পদ অধিগ্রহণ, হস্তান্তর বা বিক্রিতে জালিয়াতি, প্রতারণা বা ইচ্ছাকৃত অবমূল্যায়নে জড়িত থাকলে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড বা দুই কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এসব অপরাধকে আমলযোগ্য, অমীমাংসনীয় ও অজামিনযোগ্য করার প্রস্তাবও আছে।
এই খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্পদ অধিগ্রহণ, কেনাবেচা, হস্তান্তর, বিনিয়োগ এবং আয় বা মুনাফার ওপর কর, ভ্যাট, শুল্ক, স্ট্যাম্প শুল্ক ও নিবন্ধন ফি পুরোপুরি বা আংশিক মওকুফ করতে পারবে। বিনিয়োগে প্রণোদনা, কর অবকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো ও দেশে ফেরত আনার সুবিধা দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
মুসলিম চৌধুরীর মতে, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন যথেষ্ট নয়। ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হতে ধাপে ধাপে ব্যাংক লিকুইডেশন, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের পথে যেতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও একীভূতকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের জন্য আইনি কাঠামোও তৈরি করা দরকার বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, মলম লাগিয়ে লাগিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার সম্ভব নয়, প্রয়োজন বড় কাঠামোগত সংস্কার। না হলে এক জায়গার সমস্যা সাময়িকভাবে ঢেকে অন্য জায়গায় নতুন সমস্যা তৈরি হবে।
ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট গভর্ন্যান্সেও বড় পরিবর্তনের কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, ব্যাংক পরিচালনায় মালিকপক্ষের অতিরিক্ত প্রভাব কমিয়ে পেশাদার ও স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা বাড়াতে হবে। অনেক ব্যাংকের পর্ষদে দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবারের সদস্যরা থাকেন। অথচ ব্যাংকে মালিকের অর্থের চেয়ে সাধারণ আমানতকারী ও জনগণের অর্থই অনেক বেশি। তাই কোনো ব্যাংককে ব্যক্তিগত ‘আমার ব্যাংক’ হিসেবে চালানোর সুযোগ থাকা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

