বাংলাদেশে ভোক্তা বা খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নিতে যাচ্ছে বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এই ব্যবসা কিনতে এখন আগ্রহ দেখাচ্ছে দেশের ছয়টি ব্যাংক। এগুলো হলো ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ঢাকা ও ডাচ্–বাংলা ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর আগ্রহের মূল কারণ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ কম সুদের আমানত। তবে ব্যবসার সঙ্গে দেড় হাজার কর্মীকে নিয়ে নেওয়ার শর্ত থাকায় কেউ কেউ নতুন করে হিসাব কষছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশে ১২০ বছর ধরে ব্যাংকিং করছে। সংক্ষেপে ব্যাংকটি এসসিবি বা স্ট্যানচার্ট নামেও পরিচিত। এখন তারা ব্যক্তিগত ঋণ, শাখা কার্যক্রম, ইসলামি ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কার্ডসহ পুরো খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসাই বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।
ব্যাংকটির সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে তাদের সবচেয়ে বিস্তৃত কার্যক্রম এই খুচরা খাতেই। এর আওতায় আছে ১৮টি শাখা, একটি ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড সেবা। গ্রাহকেরা এখান থেকে স্মার্ট ও চলতি হিসাব, মেয়াদি আমানত এবং বিদেশি মুদ্রার আমানত সেবা পান। আছে প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ডভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড, জামানতবিহীন ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি সংস্কারের জন্য গৃহঋণ।
খুচরা ব্যবসায় ব্যাংকটির আমানত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ দেওয়া আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতের তুলনায় ঋণের পরিমাণ কম। ক্রেতা ব্যাংকগুলোর কাছে এই বাড়তি তারল্যও আকর্ষণীয় হতে পারে।
শুরুতে এই ব্যবসা কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছিল বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় দুই ব্যাংক ব্র্যাক ও সিটি। এখন নতুন করে যোগ দিয়েছে পূবালী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ঢাকা ও ডাচ্–বাংলা ব্যাংক।
আগ্রহী কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যে অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি বা এনডিএ সই করেছে। এই চুক্তির আওতায় তারা ব্যবসাসংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছে এবং সেই তথ্য গোপন রাখতে বাধ্য থাকছে। বাকি ব্যাংকগুলোও চুক্তি সইয়ের আগ্রহ জানিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডকে চিঠি দিয়েছে।
আগ্রহী কয়েকটি ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের খুচরা আমানতের বড় অংশই খুব কম সুদের। এসব আমানতের জন্য ব্যাংকটিকে সুদ দিতে হয় ১ থেকে ২ শতাংশ। দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশের সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশ।
এই ব্যবধান বড় হিসাবের বিষয়। একই পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করতে স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে অনেক বেশি খরচ করতে হয়। কম সুদের আমানত হাতে এলে তাদের তহবিল ব্যয় কমবে। তাতে মুনাফার সুযোগও বাড়তে পারে। ফলে ভালো আর্থিক অবস্থানের ব্যাংকগুলো এই ব্যবসার দিকে বেশি ঝুঁকছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড শুধু সম্পদ ও দায় বিক্রি করতে চায় না। তারা শর্ত দিয়েছে, ক্রেতাকে খুচরা ব্যবসায় কর্মরত দেড় হাজার কর্মীকেও নিয়ে নিতে হবে। ব্যাংকটির মোট কর্মী ১ হাজার ৯০০ জন। এর মধ্যে দেড় হাজারই খুচরা খাতে কাজ করেন।
এই শর্তে আগ্রহী ব্যাংকগুলো চাপে পড়েছে। একসঙ্গে এত কর্মী নিলে বেতন, সুবিধা ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাবে। অনেক ব্যাংকের নিজস্ব জনবলও যথেষ্ট রয়েছে। তাই কয়েকটি ব্যাংক নতুন করে লাভ–লোকসানের হিসাব করছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, তাঁরা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ব্যবসা বিক্রির পাশাপাশি কর্মীদের বিষয়েও নিশ্চয়তা চেয়েছে ব্যাংকটি। তাই অধিগ্রহণ কতটা লাভজনক হবে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এত বেশি জনবল নেওয়া তাঁদের জন্য সম্ভব নয়। আরেকটি জটিলতা আছে। খুচরা ব্যবসা কিনলেও ক্রেতা ব্যাংকগুলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নাম বা ব্র্যান্ড ব্যবহার করতে পারবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, আমানতকারীদের একটি অংশ আন্তর্জাতিক ব্র্যাঞ্চের ওপর ভরসা করে ব্যাংকটিতে টাকা রাখেন। নাম বদলে গেলে তাঁদের অনেকে আমানত তুলে নিতে পারেন। কেউ কেউ বেশি সুদের ব্যাংকে চলে যেতেও পারেন। তখন যে কম সুদের আমানতের আশায় ব্যাংকগুলো ব্যবসা কিনছে, তা কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। আগ্রহী ব্যাংকগুলোও এ নিয়ে দোটানায় রয়েছে।
ব্যবসা বিক্রির প্রক্রিয়া তদারক করছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের দুবাই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণে অভিজ্ঞ। আগে এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বও পালন করেছেন। আগ্রহী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মূলত তাঁর সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন।
তবে সরাসরি কারও কাছে ব্যবসা বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রির আগে ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিক নিলাম ডাকবে। সেই নিলামে অংশ নিয়ে যারা সবচেয়ে ভালো প্রস্তাব দেবে, তাদের মধ্য থেকেই ক্রেতা নির্ধারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের খুচরা ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখায়। এরপরই দেশের কয়েকটি ব্যাংক তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিদেশি ব্যাংকের এমন বিদায় নতুন নয়। গত বছরের মাঝামাঝি দেশে খুচরা ব্যাংকিং বন্ধের ঘোষণা দেয় আরেক বহুজাতিক ব্যাংক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন বা এইচএসবিসি। আরও আগে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক।
বাংলাদেশের সিদ্ধান্তটি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের একক কোনো পদক্ষেপ নয়। কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ব্যাংকটি আরও কয়েকটি দেশে কার্যক্রম কমিয়েছে। অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ে থেকে তারা স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তানজানিয়া ও আইভরি কোস্টে ভোক্তা, ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যাংকিং থেকে সরে গেলেও করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং চালু রেখেছে। শ্রীলঙ্কায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করে দিয়েছে।
এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, ব্যাংকটি কম লাভজনক বাজার ও সেবা থেকে সরে আসছে। বড় করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনে মনোযোগ দিচ্ছে তারা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী সরাসরি কোনো ক্রেতা বা দরদামের প্রসঙ্গে যাননি। তিনি বলেন, ব্যাংকটির গ্রুপ নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা যাচাই করে। যেখানে গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ বেশি, সেখানে সম্পদ ও মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
নিলামের সময়সূচি ও শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এসব শর্ত, বিশেষ করে কর্মীদের বিষয়ে ব্যাংকটি কতটা নমনীয় হয়, তার ওপর ক্রেতার তালিকা অনেকটাই নির্ভর করবে। শেষ পর্যন্ত কারা দর দেবে এবং কত দরে ব্যবসাটি বিক্রি হবে, তা নিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে আগ্রহ থাকবে।

