সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) জনতা ব্যাংকের প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। জনতা ব্যাংকের দাবি, ঋণটি অনেক পুরোনো এবং দীর্ঘ আইনি ও সালিসি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৩ সালেই দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতিতে নিষ্পত্তি হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইউএইর চার শাখায় ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন, হিসাবের গরমিল এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার তথ্য পাওয়া গেছে।
রোববার, ৪ অক্টোবর জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ইউএই কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছু তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, শেখ খলিফা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্স মরিস ও মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজের ঋণটি দীর্ঘদিনের। পাওনা আদায়ের চেষ্টা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, আইনি প্রক্রিয়া ও সালিসি কার্যক্রম শেষে বিধিবিধান মেনেই ঋণটি অবলোপন করা হয়েছে।
ব্যাংক আরও জানায়, গণমাধ্যমে প্রয়াত ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ছবি ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত ঋণগ্রহীতা ছিলেন শেখ খলিফা বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান। ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের সালিসি আদালতের নির্দেশনা এবং দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতির ভিত্তিতে ২০০৩ সালে ওই ঋণের চূড়ান্ত দায় নিষ্পন্ন হয়।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের চিত্র আলাদা। সেখানে ইউএইর চার শাখায় মোট ২০ কোটি ৫১ লাখ দিরহাম, অর্থাৎ ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকার ঋণ অবলোপনের তথ্য আছে। এর মধ্যে শেখ খলিফা–সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার দিরহাম, যা প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার সমান। প্রতিবেদনে আলাদাভাবে প্রায় ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি ঋণ ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যাগুলো আলাদা করে বোঝা জরুরি। ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা হলো চার শাখায় ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মোট অবলোপিত ঋণ। ৩০৪ কোটি টাকা তার একটি অংশ, যা শেখ খলিফা–সংশ্লিষ্ট ঋণ। আর ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ঋণ প্রতিবেদনে আলাদাভাবে ভুলক্রমে অবলোপনের ঘটনা হিসেবে এসেছে। অর্থাৎ ব্যাংক যে ঋণকে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া বলছে, তার বাইরেও ইউএই কার্যক্রমে অন্যান্য ঋণ অবলোপন ও হিসাব ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ঋণের বাইরেও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ইউএই শাখাগুলোর হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। শারজাহ শাখার সান্ড্রি ডিপোজিট ও সান্ড্রি অ্যাসেটের মধ্যে বড় পার্থক্য পাওয়া গেছে। দুবাই শাখার বিভিন্ন হিসাবেও গরমিলের তথ্য আছে।
ইউএই সিইও কার্যালয়ের ছয়টি ল্যাপটপ নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে। জনতা ব্যাংকের জবাব, ল্যাপটপগুলোর অস্তিত্ব আছে এবং সেগুলো দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিন ভারতীয় নাগরিক নিয়োগের বিষয়ে ব্যাংক বলছে, ইউএইতে স্থানীয় কর্মী নিয়োগে ১৯৮২ সালের স্থানীয় নিয়োগসংক্রান্ত বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই বলেও তাদের দাবি। ইতালির জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) এসআরএল বন্ধ না করার বিষয়ে ব্যাংকের ব্যাখ্যা, প্রবাসী আয় ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছে।
ফলে বিতর্কের কেন্দ্র এখন আর শুধু ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন হয়েছে কি না, তা নয়। জনতা ব্যাংক বলছে, এটি পুরোনো ও আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া ঋণ। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে একই কার্যক্রমে বড় অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের অসংগতি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। দুই পক্ষের বক্তব্য একই বিষয়ের আলাদা দিক তুলে ধরছে, তাই একটিকে অন্যটির সরাসরি খণ্ডন বলা যাচ্ছে না।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণকে সরাসরি অবৈধ বা দুর্নীতির অর্থ বলা হয়েছে, এমন দাবি করা যায় না। প্রতিবেদনে অবলোপন, হিসাবের গরমিল ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার কথা এসেছে, কিন্তু ওই ঋণ নিয়ে অনিয়মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ২০০৩ সালের নিষ্পত্তির নথি, ঋণ অবলোপনের অনুমোদন এবং পরবর্তী হিসাবরেকর্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে কতটা মেলে। এসব নথি যাচাই হলেই বোঝা যাবে, এটি কেবল পুরোনো একটি নিষ্পত্তি হওয়া ঋণের ঘটনা, নাকি ইউএই কার্যক্রমের বৃহত্তর হিসাবগত অসংগতির সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে।

