দেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাজার থেকে সরকারি সিকিউরিটিজ ফেরত কেনার নিলাম আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ বিভাগের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ঋণের চাপ সামলাতে সরকারের হাতে আধুনিক একটি নতুন হাতিয়ার যুক্ত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণ নিয়মে সরকার বন্ড বা সিকিউরিটিজ বিক্রি করে বাজার থেকে ধার নেয়। বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে হয়। এবার সেই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা না করে বিদ্যমান সিকিউরিটিজ আগেভাগেই তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় একে বলা হয় বাইব্যাক বা পুনঃক্রয়।
এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ। আন্তর্জাতিকভাবে একে ‘লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট অপারেশনস’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ সরকার কেবল নতুন ঋণ নিয়েই থেমে থাকছে না, পুরোনো দায় কীভাবে সাজিয়ে নেওয়া যায়, সেদিকেও নজর দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। প্রথমত, একসঙ্গে বিপুল অঙ্কের টাকা পরিশোধের চাপ কমবে। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে অনেক বন্ডের মেয়াদ একসঙ্গে শেষ হলে সরকারের ওপর বড় নগদ চাপ তৈরি হয়। আগেভাগে কিছু বন্ড ফেরত কিনলে সেই চাপ ভাগ হয়ে যায়।
পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি সামলানোও সহজ হবে। পুরোনো ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হয়। বাজারের অবস্থা খারাপ থাকলে তখন ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল বা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বাইব্যাকের মাধ্যমে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া ঋণ পরিশোধের সময়সূচি আরও সুষমভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারের দক্ষতা ও গতিশীলতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজারে লেনদেন বাড়লে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও শক্তিশালী হয়।
অর্থ বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি ঋণের ব্যয় ও ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে। টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং সিকিউরিটিজ বাজারের উন্নয়নে তারা একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপও নিয়েছে। প্রথম বাইব্যাক নিলাম সেই ধারাবাহিকতারই একটি বড় অগ্রগতি।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের লক্ষ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের নিলাম হবে। তবে প্রতিবার নিলাম করার সিদ্ধান্ত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি, সরকারের নগদ অর্থের অবস্থান, বাজারের তারল্য, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা এবং সরকারি ঋণের সামগ্রিক কাঠামো।
এই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাইব্যাক নিলাম কেবল একটি কারিগরি পদক্ষেপ নয়। এটি সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও পরিণত ও আধুনিক করার ইঙ্গিত দেয়। উন্নত অনেক দেশে এই পদ্ধতি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে এর সূচনা হওয়ায় সিকিউরিটিজ বাজারের কাঠামোগত উন্নয়নের পথে একটি নতুন ধাপ যুক্ত হলো।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নিলামে কী পরিমাণ সিকিউরিটিজ ফেরত কেনা হলো, কোন দরে লেনদেন হলো এবং বিনিয়োগকারীরা কতটা সাড়া দিলেন, সেসব তথ্য আগামী দিনে বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। বাজারের তারল্য ও সরকারের নগদ প্রবাহের সঙ্গে মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে এই উদ্যোগ চালিয়ে যেতে পারলেই এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে, প্রথম বাইব্যাক নিলাম বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। এটি সরকারকে ঋণের সময়সূচি ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সক্ষমতা দেবে। একই সঙ্গে সিকিউরিটিজ বাজারকে আরও গভীর ও কার্যকর করার সম্ভাবনাও তৈরি করল।

