সকালে ঘুম থেকে উঠে মুঠোফোনে ব্যাংক হিসাবের স্থিতি দেখা, কয়েক মুহূর্তে অর্থ স্থানান্তর, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ কিংবা দূরবর্তী স্থানে থাকা পরিবারের সদস্যের কাছে টাকা পাঠানো, এসবই এখন বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ব্যাংকের শাখায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ঘরে বসেই অনেক আর্থিক কাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে। মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কিউআর সংকেতের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ এবং তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর আর্থিক লেনদেনকে করেছে দ্রুত, সহজ ও সময়সাশ্রয়ী।
কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। একটি ভুয়া ফোনকল, প্রতারণামূলক বার্তা, নকল ওয়েবসাইট কিংবা অসতর্কভাবে প্রকাশ করা গোপন তথ্য মুহূর্তেই একজন মানুষের সঞ্চয় বিপন্ন করতে পারে। অন্যদিকে, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, তথ্য ফাঁস কিংবা সংগঠিত সাইবার আক্রমণ বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের আর্থিক নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
অর্থাৎ, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের গল্প নয়; এটি আস্থা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। আমরা কত দ্রুত লেনদেন করতে পারছি, তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমাদের অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত? প্রতারণার শিকার হলে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা যদি একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে এই অগ্রগতি নতুন আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার: বাংলাদেশের ২০২৫ সালের চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ২০২৪ সালের ৪৮২ কোটি ৭০ লাখ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৫৪৬ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে এসব লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্য ৯০.৩৮ লাখ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১০২.২৪ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে লেনদেনের সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরে। ডিজিটাল মাধ্যম এখন শুধু মুঠোফোনে টাকা পাঠানো বা ছোটখাটো কেনাকাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ইউটিলিটি বিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং তুলনামূলক বড় অঙ্কের পরিশোধেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
এর ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা গ্রহণে অসুবিধার সম্মুখীন ব্যক্তিরাও আগের তুলনায় সহজে আর্থিক সেবা পাচ্ছেন। তবে লেনদেনের পরিমাণ যত বাড়ছে, নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিধিও তত বিস্তৃত হতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: ডিজিটাল লেনদেনের প্রবৃদ্ধি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। বরং বৃহৎ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে নির্ভরযোগ্য রাখতে হলে প্রযুক্তিগত সুরক্ষা, কার্যকর তদারকি এবং দ্রুত প্রতিকারব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতারণার পরিসংখ্যান: ক্ষতি হচ্ছে, উদ্ধার হচ্ছে কতটুকু? বাংলাদেশ ব্যাংকের একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে মোবাইল আর্থিক সেবা, চেকভিত্তিক লেনদেন ও ব্যাংক কার্ডসংক্রান্ত প্রতারণার মোট ৮১ হাজার ৪২৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮২ কোটি ৭২ লাখ টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অর্থ উদ্ধারের হার ছিল আনুমানিক ১০.৭ শতাংশ।
মোবাইল আর্থিক সেবার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে এ খাতে প্রতারণাজনিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং অনুদ্ধারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থের প্রায় ৯১.৩ শতাংশ উদ্ধার করা যায়নি; পুনরুদ্ধারের হার ছিল মাত্র ৮.৭ শতাংশ।
এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, উল্লিখিত ৮১ হাজার ৪২৩টি ঘটনা শুধু ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের নয়; এতে তিনটি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমের প্রতারণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই এসব সংখ্যাকে দেশের সব ধরনের সাইবার অপরাধের পূর্ণাঙ্গ হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। তবু অর্থ উদ্ধারের নিম্ন হার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা নির্দেশ করে।
প্রতারণার পর অর্থ দ্রুত অন্য হিসাবে স্থানান্তরিত হলে বা একাধিক হিসাবের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়লে তা শনাক্ত ও উদ্ধার করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে শুধু অপরাধ সংঘটনের পর তদন্ত নয়, প্রতারণামূলক লেনদেনের সময়ই তা শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হিসাব স্থগিত করা এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা মূল্যায়নে তাই প্রতারণার সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ উদ্ধার, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
অদৃশ্য ঝুঁকির বহুমাত্রিক রূপ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কণ্ঠস্বর নকল ও পরিচয় জালিয়াতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে অপরাধীদের প্রতারণার কৌশল আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কণ্ঠস্বর নকল করার প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির মতো কথা বলা এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি বা ভিডিও দিয়ে পরিচয় জালিয়াতির চেষ্টা করা সম্ভব।
এ ধরনের কৌশলে অপরাধীরা পরিবারের সদস্যের বিপদের কথা বলে অর্থ চাইতে পারে, আবার প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তার পরিচয় নকল করে কর্মীকে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি দিয়ে সংঘটিত প্রতিটি প্রতারণার ব্যাপকতা বা বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এর প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য স্থানীয় তথ্য প্রয়োজন। এ অবস্থায় শুধু কণ্ঠস্বর বা ভিডিও দেখে পরিচয় নিশ্চিত করা যথেষ্ট নয়। বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় যাচাই, পৃথক অনুমোদন এবং লেনদেনের উদ্দেশ্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ফিশিং ও ভুয়া বার্তার ফাঁদ: ফিশিং হলো প্রতারণার মাধ্যমে ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল। অপরাধীরা ব্যাংকের নকল ওয়েবসাইট, ভুয়া বার্তা কিংবা প্রতারণামূলক সংযোগচিত্র ব্যবহার করে গ্রাহককে গোপন সংকেত বা হিসাবের তথ্য দিতে প্রলুব্ধ করে। মুঠোফোনের বার্তার মাধ্যমে এ ধরনের চেষ্টা হলে তাকে সাধারণত স্মিশিং বলা হয়।
কখনো বার্তায় দাবি করা হয়, গ্রাহকের হিসাব বন্ধ হয়ে যাবে; কখনো বলা হয়, পুরস্কার বা সরকারি সুবিধা পেতে দ্রুত পরিচয় যাচাই করতে হবে। তাড়াহুড়া ও ভয় সৃষ্টি করে গ্রাহককে এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা হয়, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তিনি করতেন না।
নকল ওয়েবসাইটের ঠিকানা মূল প্রতিষ্ঠানের ঠিকানার সঙ্গে সামান্য পার্থক্য রেখে তৈরি করা হতে পারে। তাই শুধু ওয়েবসাইটের চেহারা দেখে সেটিকে আসল মনে করা বিপজ্জনক। ব্যাংকের নিজস্ব প্রয়োগভিত্তিক সেবা বা আগে থেকে যাচাই করা সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করাই নিরাপদ।
ক্ষতিকর সফটওয়্যার ও ব্যাংকের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় আক্রমণ। ব্যক্তিগত গ্রাহকের মুঠোফোন থেকে শুরু করে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে, আর্থিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে কিংবা কোনো যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ অপরাধীর হাতে তুলে দিতে পারে।
ব্যাংকের ক্ষেত্রে র্যানসমওয়্যার নামের ক্ষতিকর সফটওয়্যার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া বা তথ্য আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। এ ধরনের আক্রমণে কোনো প্রতিষ্ঠানের সেবা ব্যাহত হওয়া, সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হওয়া কিংবা গ্রাহকের লেনদেনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে।
তবে প্রতিটি প্রযুক্তিগত সমস্যাই সাইবার হামলা নয়, আবার প্রতিটি হামলাও গ্রাহকের অর্থ সরাসরি চুরির ঘটনা ঘটায় না। কোনো ঘটনার প্রকৃতি নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, তথ্যের সুরক্ষিত সংরক্ষণ, বিকল্প ব্যবস্থায় কার্যক্রম চালু রাখার পরিকল্পনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক কৌশলে প্রতারণা: মানুষের বিশ্বাসই প্রধান লক্ষ্য। প্রযুক্তিগত সুরক্ষা যত উন্নতই হোক, মানুষের অসতর্কতা বা বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা প্রতারণার সুযোগ পেতে পারে। এ ধরনের কৌশলকে সামাজিক প্রকৌশল বলা হয়।ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয়ে গোপন সংকেত চাওয়া, পরিচিত ব্যক্তির ছদ্মবেশে টাকা ধার চাওয়া, পুরস্কারের প্রলোভন দেখানো কিংবা হিসাব থেকে অর্থ হারানোর ভয় দেখানো—এসব কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো গ্রাহককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা।
এখানে গ্রাহকের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এমন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা যায় এবং গ্রাহক ভুলবশত তথ্য প্রকাশ করলেও ক্ষতি সীমিত করার সুযোগ থাকে।
ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব: নিরাপত্তা কাগজে নয়, বাস্তবে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা শুধু গ্রাহকের সতর্কতার ওপর নির্ভর করে না। প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কর্মীদের দক্ষতা, ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি—সবকিছু মিলিয়েই নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হয়।
পুরোনো সফটওয়্যার, সময়মতো নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধন না করা, কর্মীদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এবং বহিরাগত প্রযুক্তিসেবাদাতার নিরাপত্তা যথাযথভাবে যাচাই না করা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত কোনো তৃতীয় পক্ষের ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলেও গ্রাহকের তথ্য বা সেবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাই প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা, দুর্বলতা শনাক্তকরণ পরীক্ষা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পাশাপাশি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কত অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বিনিয়োগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হলো এসব ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা। শুধু নীতিমালা অনুসরণের কাগজপত্র নয়, বাস্তব নিরাপত্তা পরীক্ষার ফলাফল, ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া পদক্ষেপ এবং গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করতে হবে।
২০২৬ সালের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো: বাস্তবায়নই এখন মূল পরীক্ষা। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে ‘সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো, সংস্করণ ১.০ (২০২৬)’ জারি করে। এ নির্দেশনার আওতায় তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, অর্থ পরিশোধসেবাদাতা এবং অর্থ পরিশোধব্যবস্থা পরিচালনাকারীদের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে কাঠামোটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের গুরুত্ব হলো, সাইবার নিরাপত্তাকে কেবল আক্রমণ প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, সুরক্ষা, আক্রমণ শনাক্ত করা, প্রতিক্রিয়া জানানো এবং ক্ষতির পর স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা।
কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা শতভাগ আক্রমণ-প্রতিরোধী—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাই আক্রমণ ঠেকানোর পাশাপাশি আক্রমণ ঘটলে কত দ্রুত তা শনাক্ত করা যায়, কতটা ক্ষতি সীমিত রাখা যায় এবং কত দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত হলে সংশোধনের সময়সীমা, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে জারি করা হালনাগাদ ইলেকট্রনিক গ্রাহক-পরিচিতি যাচাই নির্দেশিকাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। নির্দেশনাটি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। এর উদ্দেশ্য প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রাহকের পরিচয়ের সত্যতা যাচাই ও প্রতারণার ঝুঁকি কমানো। তবে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা কার্যকর করার সময় গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং বৈধভাবে আর্থিক সেবা গ্রহণের অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা। সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা দেখিয়েছিল, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত দুর্বলতা কীভাবে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ওই ঘটনায় অপরাধীরা আন্তর্জাতিক আন্তব্যাংক আর্থিক বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা ব্যবহার করে ভুয়া অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ পাঠিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা হলো, নিরাপত্তা শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে না; নির্দেশ যাচাই, দায়িত্বের পৃথকীকরণ, লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অস্বাভাবিক কার্যক্রমে দ্রুত প্রতিক্রিয়াও অপরিহার্য।
বর্তমান বিশ্বে ব্যাংক, অর্থ পরিশোধসেবাদাতা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র, সীমান্তপারের অর্থ স্থানান্তর এবং বিভিন্ন দেশের ভিন্ন আইন প্রয়োগব্যবস্থা তদন্তকে জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশের জন্য তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দ্রুত তথ্য বিনিময়, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং আর্থিক অপরাধের অর্থ অনুসরণ করার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু বিদেশে সংঘটিত প্রতিটি সাইবার অপরাধকে বাংলাদেশের বাস্তবতা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। নীতিনির্ধারণে স্থানীয় তথ্য, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও যাচাইযোগ্য প্রমাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উত্তরণের পথ: গ্রাহক, ব্যাংক ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন হলেও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
প্রথমত, গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচয় দিলেও ফোনে গোপন প্রবেশসংকেত, পিন বা এককালীন যাচাইকরণ সংকেত জানানো যাবে না। অপরিচিত সংযোগচিত্রে প্রবেশ, অজানা সফটওয়্যার স্থাপন কিংবা অন্য কাউকে দূর থেকে নিজের মুঠোফোন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অর্থ পাঠানোর আগে প্রাপকের পরিচয় ও হিসাবের তথ্য যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিরোধমূলক প্রযুক্তি শক্তিশালী করতে হবে। একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং তথ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে ভুল শনাক্তকরণ ও বৈধ গ্রাহকের লেনদেন আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, অভিযোগ ও অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা দ্রুততর করতে হবে। প্রতারণার অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট হিসাব শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। গ্রাহককে অভিযোগের অগ্রগতি জানানো এবং প্রতিকার সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া উচিত। অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলেও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে উদ্ধার করার সম্ভাবনা বাড়ানো যেতে পারে।
চতুর্থত, নিয়ন্ত্রক তদারকি ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ঘাটতি, প্রতারণার প্রবণতা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে সমন্বিত তথ্য প্রকাশ করলে ঝুঁকি বোঝা এবং নীতি উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।
পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ডিজিটাল আর্থিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। সাইবার অপরাধের অর্থ দ্রুত বিভিন্ন হিসাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে সহজ ভাষায় নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
নিরাপত্তা ও সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও জরুরি। এমন জটিল ব্যবস্থা তৈরি করা যাবে না, যাতে বৈধ গ্রাহক সেবা নিতে গিয়ে অযথা সমস্যায় পড়েন; আবার সহজ ব্যবহারের নামে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ধাপও বাদ দেওয়া যায় না।
আস্থাই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত ভিত্তি। ডিজিটাল ব্যাংকিং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে আর্থিক সেবা সহজ হচ্ছে, লেনদেনের সময় কমছে এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়া সমাধান নয়; বরং এর নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান একদিকে ডিজিটাল লেনদেনের দ্রুত বিস্তার তুলে ধরে, অন্যদিকে প্রতারণাজনিত ক্ষতির বিপরীতে অর্থ উদ্ধারের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে। ২০২৬ সালের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো ও হালনাগাদ পরিচয় যাচাই নির্দেশিকা এ পরিস্থিতি মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে নীতিমালা জারি করাই শেষ কথা নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং ফলাফলের স্বচ্ছ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। গ্রাহককে সচেতন থাকতে হবে, ব্যাংককে অর্থ ও তথ্য সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু দ্রুত লেনদেনে নয়; বরং নিরাপদ লেনদেন, কার্যকর প্রতিকার এবং জনআস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া নয়, আবার অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও নয়—বরং সচেতন ব্যবহার, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ও কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমে এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগবে এবং অদৃশ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে

