দেশের ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বাড়তি অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। একদিকে ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের গতি কিছুতেই বাড়ছে না।
ফলে এই বিপুল অর্থ কাজে লাগানোর জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না অনেক ব্যাংক। বাধ্য হয়ে বেশির ভাগ ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ খাটাচ্ছে, আর একটি অংশ পড়ে আছে সম্পূর্ণ অলস। ব্যাংক নির্বাহীদের ভাষ্য, এই অলস অর্থের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদন বলছে, আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলোর মোট তারল্যের স্থিতি ছিল ৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিধিবদ্ধ ন্যূনতম তারল্য সংরক্ষণ করতে হতো ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এই দুইয়ের ব্যবধানই উদ্বৃত্ত তারল্য, যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি অর্থ ব্যাংক খাতে মজুত আছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে প্রচলিত ধারার বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে। এই শ্রেণির ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য সম্পদ ছিল ৪ লাখ ৬৬ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। ন্যূনতম প্রয়োজন ছিল ১ লাখ ৯৪ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। ফলে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা, আর ন্যূনতম প্রয়োজন ৯০ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। এতে উদ্বৃত্ত থাকছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। তবে এর সিংহভাগই সোনালী ব্যাংকের কাছে। জনতা ও বেসিক ব্যাংকের মতো দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বরং তারল্য সংকটে ভুগছে।
ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য ৩৭ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ছিল ৩৫ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ ধারায় উদ্বৃত্তের পরিমাণ খুবই সামান্য। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য ছিল ৪২ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা, ন্যূনতম প্রয়োজন ১৬ হাজার ২ কোটি টাকা। সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য ২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা এবং প্রয়োজন ২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। তবে এই ব্যাংকগুলোকে বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত বা এসএলআর সংরক্ষণ করতে হয় না।
বেসরকারি খাতের সব ব্যাংকের চিত্র এক নয়। প্রচলিত ধারার অন্তত এক ডজন ব্যাংক তারল্য সংকটে আছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া এসব ব্যাংক গ্রাহকের আস্থার সংকটে ভুগছে। উচ্চ সুদ দিয়েও আমানতকারীদের টানা যাচ্ছে না। বিপরীতে ভালো ভাবমূর্তির শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে আমানত উপচে পড়ছে। কম সুদ দেওয়ার পরও গ্রাহকেরা সেখানে টাকা রাখতে ভিড় করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এই ব্যবধান বলছে, ব্যাংক খাতের সমস্যা শুধু অর্থের অভাব বা প্রাচুর্যের নয়, আস্থার। আমানতকারীরা সুদের হারের চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে অর্থ জমছে কয়েকটি শক্তিশালী ব্যাংকে, আর দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও কোণঠাসা হচ্ছে।
উদ্বৃত্ত তারল্যে ভরা ব্যাংকগুলোর একটি পূবালী ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, সম্প্রতি ব্যাংকটি আমানত এক লাখ কোটি টাকায় নেওয়ার একটি প্রচারণা চালায়। প্রচারণা শেষে আমানত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অল্প সময়েই বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরে এ পর্যন্ত আমানত বেড়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বছর শেষে এই বৃদ্ধি ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে তিনি আশা করছেন।
মোহাম্মদ আলীর মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এ কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনো ৪ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। তাঁরা এসএমই, কৃষি ও খুচরা ব্যাংকিংয়ের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং সেখানে সাড়া ভালো। তিনি আশা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ইউরোপের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশে বিনিয়োগের চাহিদা বাড়বে।
এই বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। তারল্যের এই স্ফীতি ব্যাংকের সক্ষমতার সমস্যা নয়, বরং বাস্তব অর্থনীতির চাহিদার সংকট। ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ আছে, কিন্তু নিতে চাওয়ার মতো উদ্যোক্তা কম।
ঋণ ও আমানতের অনুপাতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের অগ্রিম-আমানত অনুপাত ছিল ৮০.৩৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৮১.৩২ শতাংশে ওঠে। এরপর থেকে কমতে থাকে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে অনুপাত নামে ৭৮.২৮ শতাংশে। গত ডিসেম্বরে তা আরও কমে হয় ৭৭.৭২ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে অনুপাত আরও নেমে দাঁড়িয়েছে ৭৫.৮০ শতাংশে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকগুলো আমানতের তুলনায় কম অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। ফলে তারল্যের যে অংশ ঋণ ও বিনিয়োগে ব্যবহৃত হচ্ছে না, তা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তৈরিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। অর্থনীতিতে গতি আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যার বাস্তবায়ন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে আনা হয়েছে। তাঁর প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং ব্যাংকের বাড়তি তারল্যও কমে আসবে।
নীতি সুদহার সামান্য কমানো ও প্রণোদনা প্যাকেজ চালু হলেও এখনো ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরেই আছে। এতে বোঝা যায়, শুধু সুদের হার কমিয়ে বা তহবিল জোগান দিয়ে বিনিয়োগ টানা কঠিন। বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দূর না হলে ব্যাংকের এই অলস অর্থ কাজে লাগার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে ঋণের বদলে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে অর্থ খাটানোর প্রবণতা ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ আয় দিলেও বাস্তব অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়ায় না। আবার আস্থার সংকটে থাকা দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট ও সবল ব্যাংকগুলোতে অর্থের ভিড়, এই বৈষম্য খাতটির কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতাই তুলে ধরছে। উদ্যোক্তা পর্যায়ে চাহিদা ফেরানো এবং দুর্বল ব্যাংকের আস্থা পুনরুদ্ধার, দুটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

