জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আজ আর কেবল পরিবেশগত সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো ও জনজীবনে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার আর্থিক মূল্যও ক্রমাগত বাড়ছে।
ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষা, জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় গ্রিন ব্যাংকিং ও জলবায়ু অর্থায়ন টেকসই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ব্যাংকের অর্থ কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে, সেই বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা কতটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এসব প্রশ্ন এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার কেন্দ্রে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একদিকে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলা এবং অর্থনীতিকে দুর্যোগসহনশীল করার জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রিন ব্যাংকিং ও জলবায়ু অর্থায়ন: ধারণা থেকে বাস্তবতা। গ্রিন ব্যাংকিং বলতে এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমে পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কাগজের ব্যবহার হ্রাস, ডিজিটাল লেনদেন, জ্বালানিসাশ্রয়ী শাখা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এর অংশ। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্যপানি শোধন, জ্বালানিদক্ষ প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ঋণ প্রদানও এর আওতাভুক্ত।
অন্যদিকে, জলবায়ু অর্থায়ন বলতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর জন্য সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করাকে বোঝায়। এর দুটি প্রধান ক্ষেত্র রয়েছে। প্রথমটি প্রশমন, যার লক্ষ্য কার্বন নিঃসরণ কমানো; দ্বিতীয়টি অভিযোজন, যার লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা।
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রশমনমূলক উদ্যোগের উদাহরণ। অন্যদিকে, উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা, বন্যার পূর্বাভাসব্যবস্থা উন্নত করা, লবণসহিষ্ণু ফসলের চাষ সম্প্রসারণ এবং ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ অভিযোজনের অন্তর্ভুক্ত। দুটি ক্ষেত্রেই ব্যাংকিং খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সবুজ অর্থায়ন, টেকসই অর্থায়ন ও জলবায়ু অর্থায়নকে এক অর্থে ব্যবহার করা ঠিক নয়। টেকসই অর্থায়নের আওতায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগও থাকতে পারে; কিন্তু সেগুলোর সবই সরাসরি জলবায়ু অর্থায়ন নয়।
বাংলাদেশের অগ্রগতি ও অর্থায়নের বাস্তব চিত্র। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরিতে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০১১ সালে গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা প্রবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে টেকসই অর্থায়ন এবং পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক নির্দেশনার মাধ্যমে এই কাঠামো আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবে কতটুকু অর্থ পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে যাচ্ছে, তা পর্যালোচনা করাও জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়নবিষয়ক ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের প্রতিবেদন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট টেকসই অর্থায়ন ছিল ১ লাখ ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে, সরাসরি পরিবেশবান্ধব বা সবুজ প্রকল্পে অর্থায়ন ছিল ৫ হাজার ১৯৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই অর্থায়ন আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমেছে।
পরিসংখ্যানগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। সামগ্রিক টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ বড় হলেও সরাসরি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে না। মোট টেকসই অর্থায়নকে সরাসরি সবুজ অর্থায়নের সমতুল্য ধরে নিলে এই পার্থক্য আড়ালে থেকে যাবে।
অতএব, শুধু ঋণ বিতরণের মোট পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; অর্থায়নের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও বাস্তব ফলাফলও বিবেচনা করতে হবে। কতটি প্রকল্পে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে, কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে, কত পানি পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে এবং কতটা দূষণ কমেছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে অর্থায়নের কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা ও অর্থায়নের বিশাল ব্যবধান। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদে জমা দেওয়া এই দলিলে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সময়কালের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দলিল অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রবণতার তুলনায় বাংলাদেশ মোট নিঃসরণ ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব সম্পদনির্ভর লক্ষ্য ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তানির্ভর অতিরিক্ত লক্ষ্য ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রশমনমূলক কার্যক্রমে আনুমানিক ১১৬ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার নিজস্ব সম্পদ থেকে এবং ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শুধু সরকারি বাজেট কিংবা দেশীয় ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী, বহুপক্ষীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
তবে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংগ্রহ করাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। অর্থের শর্ত, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত অভিযোজনমূলক প্রকল্পে সামাজিক সুফল অনেক সময় প্রত্যক্ষ আর্থিক মুনাফার চেয়ে বেশি হয়। ফলে উপকূলীয় সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও কৃষির অভিযোজনের মতো প্রকল্পে অনুদান এবং স্বল্পসুদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্ব বেশি।
বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন: বিনিয়োগ বাড়লেও গতি অপর্যাপ্ত। জলবায়ু অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিরও অন্যতম বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট পলিসি ইনিশিয়েটিভের ২০২৬ সালের গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ অব ক্লাইমেট ফাইন্যান্স প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়ন প্রথমবারের মতো ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে। ২০২৫ সালে এর পরিমাণ আনুমানিক ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
কিন্তু অর্থায়নের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে জলবায়ু অর্থায়নের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ শতাংশ; ২০২৪ সালে তা কমে ৬ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২৫ সালে আনুমানিক ২ থেকে ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। অথচ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমান বিনিয়োগের পরিমাণ প্রয়োজনীয় অর্থায়নের তুলনায় অনেক কম। এ ব্যবধানের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব দেশে একদিকে জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হয়, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ন্যায্য প্রাপ্যতা, সহজ শর্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতির তাৎপর্য স্পষ্ট। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি এমন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঋণের বোঝা অসহনীয় না হয় এবং প্রকৃত পরিবেশগত সুফলও অর্জিত হয়।
ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ঝুঁকি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পথে কয়েকটি বাস্তব বাধা রয়েছে। ব্যাংকগুলোকে আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা, ঋণ আদায়, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং মূলধন সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। খেলাপি ঋণের চাপ ও আর্থিক দুর্বলতা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
অনেক পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় বেশি এবং বিনিয়োগের সুফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কারখানায় জ্বালানিদক্ষ যন্ত্রপাতি স্থাপন বা বর্জ্যপানি শোধনাগার নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। ছোট উদ্যোক্তার পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে। ব্যাংকও যদি স্বল্প মেয়াদে ঋণ পরিশোধের শর্ত আরোপ করে, তবে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হলেও উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন।
এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রকল্পের সম্ভাব্য নগদ অর্থপ্রবাহ, বিনিয়োগ ফেরতের সময় এবং পরিবেশগত সুফল বিবেচনা করে ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি পুনঃঅর্থায়ন, ঋণ নিশ্চয়তা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। তবে ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা উপেক্ষা করে কেবল পরিবেশবান্ধব ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোও সমাধান নয়। ঋণের মান, প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আর্থিক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত। জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাংকের জন্য প্রধানত দুটি ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। প্রথমটি ভৌত ঝুঁকি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, খরা কিংবা লবণাক্ততার কারণে ঋণগ্রহীতার সম্পদ ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়টি রূপান্তরজনিত ঝুঁকি। কম-কার্বনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের সময় পরিবেশগত বিধিবিধান, প্রযুক্তি, জ্বালানির মূল্য এবং বাজারের চাহিদা বদলে যাওয়ায় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়তে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত কোনো কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্যা বা লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংকের ঋণ আদায়ও ঝুঁকির মুখে পড়ে। আবার পরিবেশদূষণকারী প্রযুক্তিতে পরিচালিত কারখানাকে নতুন পরিবেশগত মান পূরণ করতে বড় বিনিয়োগ করতে হতে পারে। তাই ঋণ অনুমোদনের সময় শুধু বর্তমান আয় ও জামানত নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক নির্দেশিকা জারি করে। এতে জলবায়ু-সম্পর্কিত ঝুঁকি ও সুযোগ শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় নির্ধারিত কাঠামো অনুসারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জলবায়ু ঝুঁকিসংক্রান্ত প্রতিবেদন অর্ধবার্ষিক ভিত্তিতে জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এ উদ্যোগ কার্যকর করতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং ঋণ অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বন্যাপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং উচ্চ তাপমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা শিল্পাঞ্চলের জন্য পৃথক মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তোলা যেতে পারে।
গ্রিনওয়াশিং ও তথ্যের স্বচ্ছতা। পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সম্প্রসারণের সঙ্গে গ্রিনওয়াশিংয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বাস্তবে উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত উন্নতি না ঘটিয়েও নিজেদের প্রকল্পকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে প্রচার করতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হন এবং প্রকৃত পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ অর্থায়নের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রকল্পের শ্রেণিবিন্যাস, যাচাইযোগ্য মানদণ্ড এবং স্বাধীন নিরীক্ষার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। ব্যাংককে ঋণগ্রহীতার ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বিবরণ, শক্তি ও পানির ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রত্যাশিত পরিবেশগত সুফল যাচাই করতে হবে।
এ ছাড়া অর্থায়নের পরিমাণের পাশাপাশি বাস্তব ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন। কতটুকু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে, কত পানি সাশ্রয় হয়েছে এবং কতটা দূষণ কমেছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে বিনিয়োগের কার্যকারিতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, উপগ্রহচিত্র ও আধুনিক তথ্য বিশ্লেষণব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। তবে ব্যয়বহুল প্রযুক্তি গ্রহণের আগে তার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগিতা যাচাই করা উচিত।
কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ক্ষুদ্র কৃষক, মৎস্যচাষি, নারী উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ ব্যবসায়ীদের জন্য অর্থায়ন সহজ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসব জনগোষ্ঠীর অনেকেরই পর্যাপ্ত জামানত, প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক নথি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত।
জলবায়ু-সহনশীল বীজ, সৌরচালিত সেচ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, উন্নত মৎস্যচাষ এবং দুর্যোগসহনশীল ব্যবসায়িক অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য তাঁদের সহজ শর্তে অর্থায়ন প্রয়োজন। কৃষকের মৌসুমি আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণের কিস্তি নির্ধারণ, দুর্যোগের সময় সাময়িক ঋণ-সুবিধা এবং কৃষি বীমার সম্প্রসারণ এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থায়ন পৌঁছানোর পাশাপাশি প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল পর্যবেক্ষণও সহজ হবে।
উত্তরণের পথ: নীতিমালা থেকে কার্যকর বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে গ্রিন ব্যাংকিং ও জলবায়ু অর্থায়নের কার্যকারিতা বাড়াতে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করতে হবে। ব্যাংকগুলোর প্রতিবেদন যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের পরিবেশগত ফলাফল মূল্যায়ন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও উপযোগী ঋণশর্ত নিশ্চিত করতে হবে। পুনঃঅর্থায়ন, ঋণ নিশ্চয়তা এবং সুস্পষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে মূলধন সংরক্ষণ বা তারল্যসংক্রান্ত নিয়মে যেকোনো ছাড় আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয়ত, সবুজ বন্ড ও নীল বন্ডের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। সবুজ বন্ডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে এবং নীল বন্ডের মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদ, উপকূলীয় পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত উপযুক্ত প্রকল্পে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে অর্থের ব্যবহার, ফলাফল প্রকাশ এবং স্বাধীন নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মানসম্মত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি, পরিবেশগত মূল্যায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফল পরিমাপের জন্য দক্ষ বিশেষজ্ঞ দল গঠন জরুরি।
পঞ্চমত, ব্যাংক কর্মকর্তাদের জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এতে প্রকল্প নির্বাচন উন্নত হবে এবং অর্থায়নের অপচয় কমবে। ষষ্ঠত, জলবায়ু অর্থায়নের জন্য সরকারি বাজেট, দেশীয় ব্যাংক, বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী অনুদান, স্বল্পসুদের ঋণ এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উপযুক্ত সমন্বয় নিশ্চিত করাই হবে এ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি হোক দায়িত্বশীল অর্থায়ন। গ্রিন ব্যাংকিং ও জলবায়ু অর্থায়ন এখন আর কেবল পরিবেশ রক্ষার আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং জনগণের জীবনমান রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যত বাড়বে, ততই ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং আর্থিক সম্পদের কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একদিকে ২০৩৫ সালের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশীয় আর্থিক খাতের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রাপ্যতা সেই প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্যও দেখায়, সামগ্রিক টেকসই অর্থায়ন বাড়লেও সরাসরি সবুজ প্রকল্পে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।
এই ব্যবধান কমাতে হলে নীতিমালা, অর্থায়ন ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে পরিবেশগত ঝুঁকি উপেক্ষা করে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দিতে হবে। সরকারকে জলবায়ু অর্থায়নকে বাজেট, শিল্পনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অনুদান, প্রযুক্তি ও স্বল্পসুদের অর্থায়ন সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দায়িত্বশীল ব্যাংকিং এবং স্বচ্ছ অর্থায়নের মাধ্যমে এই দুই লক্ষ্যকে পরস্পরের পরিপূরক করা সম্ভব। বাংলাদেশ যদি অর্থায়নের পরিমাণের পাশাপাশি তার গুণগত মান, অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ও বাস্তব পরিবেশগত সুফল নিশ্চিত করতে পারে, তবে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার সুযোগও সৃষ্টি হবে।
সুতরাং, টেকসই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কত অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর নয়, বরং অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কী ফলাফল সৃষ্টি করছে এবং সেই ফলাফল কতটা স্বচ্ছভাবে যাচাই করা যাচ্ছে তার ওপর। এই উপলব্ধিকে নীতি ও বাস্তবায়নের কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারলেই গ্রিন ব্যাংকিং ও জলবায়ু অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

