অনুমোদিত মূলধন দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের সম্মতি নিতে আজ রোববার বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) ডেকেছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সভাটি অনুষ্ঠিত হবে বেলা ১১টায়। ব্যাংকটির পর্ষদ অনুমোদিত মূলধন বর্তমানের ২ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শেয়ারধারীদের অনুমোদনের পাশাপাশি এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিও নিতে হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। মূলধন বাড়াতে হলে ব্যাংকটির সংঘবিধি ও সংঘস্মারকের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করতে হবে। সেই সংশোধনের জন্যই আজকের সভা আহ্বান করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। অনুমোদিত মূলধন হলো কোনো কোম্পানি সর্বোচ্চ কত টাকার শেয়ার ইস্যু করতে পারবে, তার আইনগত সীমা। আর পরিশোধিত মূলধন হলো শেয়ারধারীদের কাছ থেকে প্রকৃতপক্ষে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। অনুমোদিত মূলধন বাড়লেই তাৎক্ষণিকভাবে নতুন অর্থ ব্যাংকে ঢোকে না। তবে ভবিষ্যতে রাইট শেয়ার, বোনাস শেয়ার বা অন্য মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৫৬১ কোটি ৭২ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ অনুমোদিত মূলধনের সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। প্রতিবছর স্টক বা বোনাস লভ্যাংশ দিলে পরিশোধিত মূলধন বাড়তে থাকে। সীমা না বাড়ালে ভবিষ্যতে এ ধরনের লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসত। এ কারণেই মূলধনের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংকটির রিজার্ভ রয়েছে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
চলতি ২০২৬ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪ টাকা ৩৯ পয়সা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে এটি ছিল ৩ টাকা ৭০ পয়সা (পুনর্মূল্যায়িত)। অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ শেষে শেয়ারপ্রতি সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ৪৮ টাকা ৯০ পয়সা। ছয় মাসের আয়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এনএভিপিএস ২০২৫ সালের শেষের তুলনায় কিছুটা কম। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এটি ছিল ৫৪ টাকা ৩২ পয়সা।
গত পাঁচ বছরের আর্থিক ধারাও লক্ষণীয়। ২০২২ হিসাব বছরে ব্যাংকটির ইপিএস ছিল ৫ টাকা ৪৯ পয়সা, যা আগের বছরের ৪ টাকা ২৩ পয়সার চেয়ে বেশি। ওই বছর বিনিয়োগকারীরা ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ পান। বছর শেষে এনএভিপিএস ছিল ৪১ টাকা ৯৬ পয়সা।
২০২৩ সালে ইপিএস সামান্য বেড়ে হয় ৬ টাকা ৭৬ পয়সা। ওই বছর মোট লভ্যাংশ ছিল ২৫ শতাংশ, যার অর্ধেক নগদ ও অর্ধেক স্টক, অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ করে। বছর শেষে এনএভিপিএস দাঁড়ায় ৪৬ টাকা ৩৩ পয়সা।
২০২৪ সালে ইপিএস হয় ৬ টাকা ৭৪ পয়সা, আগের বছরের ৬ টাকা ১ পয়সার তুলনায় যা বেশি। ওই বছরও লভ্যাংশ ছিল ২৫ শতাংশ, নগদ ও স্টক সমান ভাগে। বছর শেষে এনএভিপিএস ছিল ৪৬ টাকা ৮ পয়সা।
সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা যায় ২০২৫ সালে। ওই বছর ইপিএস বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৩৮ পয়সা, যা আগের বছরের ৫ টাকা ৯৯ পয়সার চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি। ব্যাংকটির পর্ষদ ২০২৫ সালের জন্য ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর অর্ধেক ১৫ শতাংশ নগদ এবং বাকি ১৫ শতাংশ স্টক। বছর শেষে এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৫৪ টাকা ৩২ পয়সা।
এই তথ্য থেকে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ব্যাংকটির আয় ও লভ্যাংশ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। লভ্যাংশের একটি বড় অংশ স্টক আকারে দেওয়ায় পরিশোধিত মূলধনও বেড়েছে। ফলে নতুন করে মূলধনের সীমা বাড়ানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থাকলে বড় মূলধনভিত্তি সহায়ক হবে।
ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস পিএলসি (সিআরআইএসএল) পূবালী ব্যাংকের ঋণমান দীর্ঘমেয়াদে ‘এএএ’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-১’ প্রত্যয়ন করেছে। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন এবং রেটিং ঘোষণার দিন পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক গুণগত ও পরিমাণগত তথ্যের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে। রেটিংয়ের এই অবস্থান ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতার ওপর আস্থার একটি ইঙ্গিত।
১৯৮৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৫৬ কোটি ১৭ লাখ ২১ হাজার ৮৪২। এর মধ্যে ৩১ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। বাকি ৪৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এই বড় অংশীদারিত্বের কারণে মূলধন-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত বাজারে আলাদা গুরুত্ব পায়।
আজকের ইজিএমে প্রস্তাব অনুমোদিত হলে পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি নিতে হবে। দুই ধাপের অনুমোদন পাওয়া গেলেই অনুমোদিত মূলধন ৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হবে। এরপর ব্যাংকটি ভবিষ্যতে কীভাবে ও কখন পরিশোধিত মূলধন বাড়াবে, সে বিষয়ে আলাদা সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা সেই সিদ্ধান্তের দিকেই নজর রাখবেন।

