বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আকস্মিক চাপ কমাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার ধরে রাখার অনুমোদিত সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২২ সালের ডলার সংকটের পর চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্যাংকগুলোর নিট বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান বা এনওপি সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে কয়েকটি ব্যাংকের ডলার ধরে রাখার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমা ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮ কোটি ডলার করা হয়েছে। এতে আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির বড় অঙ্কের ঋণপত্রের দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলো বাড়তি সুবিধা পাবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বড় আমদানি বিল পরিশোধে বাড়বে স্বস্তি
নিয়ন্ত্রক কাঠামো অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ ও দায়ের নিট পার্থক্যকে নিট ওপেন পজিশন বা এনওপি বলা হয়। এ সীমা নির্ধারণ করে একটি ব্যাংক কতটুকু নিট বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।
সীমা কম থাকলে বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধের আগে ব্যাংকগুলোকে অল্প সময়ের মধ্যে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার কিনতে হতে পারে। এতে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হয়।
সামনে রমজানকে কেন্দ্র করে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পেট্রোবাংলার মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি আমদানির বিপুল অঙ্কের বিলও পরিশোধ করতে হবে।
এনওপি সীমা বাড়লে ব্যাংকগুলো আগেভাগে ধাপে ধাপে ডলার সংগ্রহ করে রাখতে পারবে। ফলে বড় বিল পরিশোধের দিন বাজার থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডলার কেনার প্রয়োজন কমতে পারে। এতে ডলারের দর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার চাপও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।
কয়েকটি ব্যাংকের সীমা বাড়ানোর আবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে আবেদনের ভিত্তিতে ব্র্যাক ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের এনওপি সীমা বাড়িয়েছে। একটি ব্যাংকের সীমা ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮ কোটি ডলার করা হয়েছে।
ইস্টার্ন ব্যাংক তাদের সীমা প্রায় ৪ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭ কোটি ডলার করার আবেদন জানিয়েছে। অন্যদিকে সিটি ব্যাংকের এনওপি সীমা আগে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার থেকে কমিয়ে ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার করা হয়েছিল। ব্যাংকটি সীমা পুনর্বিবেচনার জন্য নতুন করে আবেদন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছানো এবং তা দিয়ে প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা থাকায় সীমা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রমজানের আগে কেন গুরুত্বপূর্ণ এ সিদ্ধান্ত
রমজানের আগে ভোজ্যতেল, চিনি, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাড়তে পারে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির বড় অঙ্কের বিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংকারদের মতে, কোনো ব্যাংককে এক দিনে ১০ কোটি ডলারের বিল পরিশোধ করতে হলে একই দিনে বাজার থেকে পুরো অর্থের ডলার কেনা কঠিন হতে পারে। এতে ডলারের চাহিদা বেড়ে বিনিময় হারও বাড়তে পারে। সীমা বাড়ানো হলে ব্যাংকটি আগেই ডলার সংগ্রহ করে রাখতে পারবে, ফলে পরিশোধের দিন বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরির আশঙ্কা কমবে।
তবে অনুমোদিত সীমা বাড়ানো মানেই ব্যাংকের হাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত ডলার চলে আসা নয়। ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিদ্যমান পরিশোধযোগ্য দায় এবং বাজারে ডলারের প্রকৃত সরবরাহের ওপরই এ সুবিধার কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
বাজারে ইতিবাচক সংকেত, তবে সতর্কতাও জরুরি
ব্যাংকার ও ট্রেজারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এনওপি সীমা বাড়ানো বড় অঙ্কের আমদানি বিল পরিশোধে নমনীয়তা বাড়াতে পারে। তবে এর অপব্যবহার হলে বাজারে নতুন চাপও তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকগুলো ডলারের দাম আরও বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় আন্তব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি না করে নিজেদের কাছে ধরে রাখলে অন্য ব্যাংকগুলোর জন্য সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে বাজারে ডলারের সংকট বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২২ সালের ডলার সংকটের সময় কয়েকটি ব্যাংকের ডলার ধরে রাখার প্রবণতায় আন্তব্যাংক লেনদেন ব্যাহত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন।
এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে, বাড়তি এনওপি সীমা প্রকৃত আমদানি দায় পরিশোধ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহার হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকেও দায়িত্বশীলভাবে ডলার ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত না হয়।
সব মিলিয়ে, ডলার ধরে রাখার সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বড় আমদানি বিল পরিশোধে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ডলারের সরবরাহ, ব্যাংকগুলোর লেনদেন এবং বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানের ওপর কার্যকর নজরদারি অব্যাহত রাখা জরুরি।

