ইংরেজি মাধ্যমের অভিজাত প্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা লিমিটেড আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে শত শত কোটি টাকার ঋণের দায়ে জর্জরিত। ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির মোট দায় ৭৩০ কোটি টাকা, যার ৭২৭ কোটি টাকাই খেলাপি।
আবার অডিট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটি ৪২৫ কোটি টাকার বেশি অর্থ দিয়েছে ক্রিসেন্ট লিমিটেড নামের একটি কোম্পানিকে। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে নথিতে দেওয়া ঠিকানায় সেই কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য নেই।
আইএফআইসি ব্যাংকের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্কলাস্টিকা দীর্ঘমেয়াদে ৩১৯ কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৩৭৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। ঋণের বোঝা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, ঋণগুলো পুনঃতফসিল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কো-অর্ডিনেটর (কমিউনিকেশন এক্সিকিউটিভ অফিসার) জিয়া হাসান বলেন, ঋণের বিষয়ে তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করছেন এবং সেই অনুযায়ীই এগোচ্ছেন।
প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের কাঠামো নিয়ে। স্কলাস্টিকা অভিভাবকদের কাছ থেকে মাসিক টিউশন ফি, সেশন ফি এবং ভর্তির সময় বড় অঙ্কের জামানত বা অগ্রিম আদায় করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন আয় থাকার পরও কেন সাড়ে সাতশ কোটি টাকার কাছাকাছি ব্যাংকঋণ নিতে হলো এবং কেন তার প্রায় পুরোটাই খেলাপি হলো, সে প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এখনো মেলেনি। ঋণের অর্থ কোথায় ও কীভাবে খরচ বা স্থানান্তর হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে নিয়ে অনুসন্ধানে আরও কিছু তথ্য উঠে এসেছে। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি অনুযায়ী, কোম্পানিটির নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুর রউফ, সালাউদ্দিন খান মজলিস ও গাজী মনিরুল ইসলাম। আব্দুর রউফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাকি দুজন পরিচালক হিসেবে উল্লেখিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আব্দুর রউফ ও সালাউদ্দিন মজলিস এর আগে নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানেও পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। একই সময়ে সালমান এফ রহমান আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই যোগসূত্র ধরে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে অর্থ সরানো হয়েছে কি না। তবে প্রতিবেদনে এর পক্ষে সরাসরি কোনো প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের উল্লেখ নেই।
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নথিতে থাকা ঠিকানাগুলো সরেজমিন যাচাই করেছে প্রতিবেদক। আব্দুর রউফের ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১ নম্বর রোডের ৪৮ নম্বর বাড়ি। কিন্তু প্রতিবেদকের দাবি, ওই রোডে জোড় সংখ্যার ক্রমানুসারে এমন কোনো বাড়ি নেই। গাজী মনিরুল ইসলামের ঠিকানা ছিল মিরপুর-১-এ বেক্সিমকো রিয়েল এস্টেটের নিয়ন্ত্রণাধীন মুনসী লেক ভিউ অ্যাপার্টমেন্টের ৮/২ নম্বর ভবন। সেখানেও ওই নম্বরের কোনো বাড়ি পাওয়া যায়নি। ওই আবাসিক এলাকার বি-২ নম্বর ভবনে গাজী মনিরুল ইসলাম নামে একজনের সন্ধান মিললেও তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী। প্রতিবেদক জানিয়েছে, তাঁর সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তৃতীয় পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের ঠিকানা ছিল ইস্কাটন প্লাজা। সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা প্রতিবেদককে জানান, তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও সেখানে পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্কলাস্টিকা এবং এর মূল অভিভাবক প্রতিষ্ঠান অ্যাসেন্ট গ্রুপের অন্যতম প্রধান শুভাকাঙ্ক্ষী ও সেবাগ্রহীতা ছিলেন সালমান এফ রহমান। সূত্রের বরাতে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে, তবে এর কোনো নথিগত প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিবেদকের ভাষ্য, বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তারা ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নেতৃত্বে ছিলেন।
স্কলাস্টিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও কূটনীতিক ইয়াসমিন মুর্শেদ। ২০২৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর অ্যাসেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা মাদিহা মুর্শেদ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। মন্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদক জানিয়েছে, তিনি দেশের বাইরে থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ স্থানান্তর, ক্রিসেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে লেনদেনের কারণ এবং ঋণ খেলাপির বিষয়ে মালিকপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো জানা যায়নি। একইভাবে সালমান এফ রহমান বা তাঁর গ্রুপের বক্তব্যও প্রতিবেদনে নেই।
এই অনুসন্ধানে মূলত দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণ প্রায় পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানটির অর্থের বড় অংশ এমন কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে, যার নথিতে থাকা ঠিকানা ও ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের অস্তিত্ব নেই বলে প্রতিবেদনের দাবি ঠিকানা যাচাইয়ের ওপর ভিত্তি করে, কোম্পানির নিবন্ধন বা কার্যক্রম নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি। অর্থ পাচার বা আত্মসাতের প্রশ্নটিও প্রতিবেদনে সন্দেহ ও প্রশ্নের আকারে এসেছে, কোনো সংস্থা বা আদালত এখনো কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিষয়টি কীভাবে খতিয়ে দেখে এবং মালিকপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: কাল বেলা

