রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই আটকে আছে মাত্র ২০ গ্রাহকের কাছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই ২০ শীর্ষ খেলাপির কাছ থেকে ব্যাংকটি আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। অথচ তাঁদের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৯ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি এক প্রতিবেদনে ব্যাংকটির এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন শেষে রূপালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৮০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণ ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে খেলাপির হার ৩৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স বিভাগ।
বড় খেলাপিদের কাছ থেকে আদায়ের চিত্র গত কয়েক বছরে ওঠানামা করেছে। ২০২৪ সালে এই ২০ খেলাপির কাছ থেকে আদায় হয়েছিল ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ৩৬১ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকায়।
সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণ থেকে আদায়ও আশানুরূপ নয়। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ থেকে আদায় করেছিল ৩৮১ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায় হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। অথচ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
শীর্ষ খেলাপির তালিকায় সবচেয়ে ওপরে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ৯৯৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন, তাদের কাছে পাওনা ৯০৮ কোটি টাকা। নারায়ণগঞ্জভিত্তিক ক্রোনি গ্রুপের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৮৭২ কোটি টাকা। খুলনার জুট টেক্সটাইল মিলসের কাছে ৭২৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপ ও এইচএস কম্পোজিটের কাছে পাওনা যথাক্রমে ৬৩০ কোটি ও ৬২০ কোটি টাকা।
তালিকায় আরও রয়েছে মাদারীপুর স্পিনিং মিলস, যার কাছে ব্যাংকের পাওনা ৬১৮ কোটি টাকা। ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের বদর স্পিনিং মিলস নিয়েছে ৬০৪ কোটি টাকা। ডলি কনস্ট্রাকশনের কাছে পাওনা ৫০৬ কোটি এবং সাত্তার গ্রুপের কাছে ৪০৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেনিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৩৭১ কোটি, খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলের কাছে ৩২৫ কোটি এবং এস আলম গ্রুপের গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন ও সোনালী ট্রেডার্সের কাছে ৩১৬ কোটি টাকা পাওনা আছে।
বসুন্ধরা গ্রুপের বসুন্ধরা মাল্টি পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ ও বসুন্ধরা পেপার মিল লিমিটেডের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৩০৯ কোটি টাকা। থার্মেক্স গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩০২ কোটি টাকা পাওনা। তালিকার বাকি খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে গ্যালকো স্টিল (বাংলাদেশ) লিমিটেড ২৮৭ কোটি, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল লিমিটেড ২৮৫ কোটি, বেঙ্গল লেদার ২৭৫ কোটি, জাপান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ পেপার লিমিটেড ২৭০ কোটি এবং ভার্গো মিডিয়া ২৪০ কোটি টাকা।
তবে রূপালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে, বসুন্ধরা পেপার মিল লিমিটেড ও ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল লিমিটেড এপ্রিলে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বেনিটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও জুট টেক্সটাইল মিলস একই উপায়ে বের হয়েছে মে মাসে।
আদায় কম হলেও ব্যাংকটি বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অবলোপন করা হয়েছে ৪৯০ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালে ৫১৮ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৪৯৪ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছিল। অবলোপনে খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে সরে যায়, কিন্তু ঋণগ্রহীতার পরিশোধের দায় থেকে যায়। তবে অবলোপন করা ঋণ থেকেও আদায় কম। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে এ খাত থেকে আদায় হয়েছিল ৪৪ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৫ সালে ২৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
মামলাজটও আদায়ের পথে বড় বাধা। জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকটির ২ হাজার ৫৯৬টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় আটকে আছে ১২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।
উচ্চ খেলাপির পাশাপাশি ব্যাংকটি তীব্র মূলধন সংকটেও রয়েছে। জুন শেষে প্রকৃত মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ২৬ কোটি টাকা হলেও নিয়ন্ত্রক সুবিধা বা রেগুলেটরি ফরবেয়ারেন্স বিবেচনায় তা নেমে এসেছে ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকায়। জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান ২৩৩ কোটি এবং নিট লোকসান ৩৯৭ কোটি টাকা। জুনের শেষে আমানত ছিল ৭২ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা, আর ঋণ ৪৭ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। ফলে ঋণ-আমানত অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি ঋণ ব্যাংকের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করছে, বিশেষ করে তারল্য সংকট বাড়াচ্ছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে অর্থ আটকে যাচ্ছে। এতে উৎপাদনশীল ও লাভজনক খাতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমছে। মূলধন ঘাটতি পুরো আর্থিক খাতের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি। শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, এতে ঋণ আদায় ও পুনর্বিনিয়োগের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের মুনাফা, মূলধন পর্যাপ্ততা, নতুন ঋণ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ পড়ছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ায় ব্যাংকটির ধারাবাহিক লোকসান ও মূলধন ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও নাড়া দিচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এতে শেয়ারের দামেও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
আর্থিক সংকটের মধ্যেও কৃষিঋণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটি ৪০০ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০৫ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। দুই বছরেই তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বেশি।
খেলাপি ঋণ কমাতে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মূলধন ঘাটতি ও উচ্চ খেলাপিতে থাকা ব্যাংকগুলোর তদারকি জোরদার করতে প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ অবলোপননীতি হালনাগাদ করেছে এবং অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছে। পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শীর্ষ ২০ খেলাপির জন্য মাসিক ও ত্রৈমাসিক নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে রূপালী ব্যাংকের চিত্র দেখাচ্ছে, বড় খেলাপিদের কাছ থেকে আদায়ে দুর্বলতা, অবলোপনের ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘ মামলাজট একসঙ্গে ব্যাংকটিকে চাপে ফেলেছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠান খেলাপি তালিকা থেকে বেরিয়ে এলেও সার্বিক ঝুঁকি কমেনি। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি ও আদায়ের নতুন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে কতটা ফল দেয়।

