দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন সুযোগ তৈরি করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে উৎপাদন ও সেবা খাতের কোম্পানিগুলো অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের কাছে অগ্রাধিকার শেয়ার বা প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করতে পারবে। একই সঙ্গে এসব শেয়ারের লভ্যাংশ ও বিনিয়োগের অর্থ বিদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। ফলে সাধারণ শেয়ারের বাইরে ভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে বিদেশি পুঁজি আনার সুযোগ তৈরি হলো।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত সংবাদে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩ নভেম্বর জারি করা ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনভেস্টমেন্ট ডিপার্টমেন্টের (এফইআইডি) সার্কুলার নং ০৪-এর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪, বিএসইসির প্রযোজ্য বিধিবিধান এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সংঘস্মারক ও সংঘবিধি মেনে এ ধরনের শেয়ার ইস্যু করতে হবে। বিনিয়োগের অর্থ অবশ্যই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে আনতে হবে।
অগ্রাধিকার শেয়ারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছাড়টি দেওয়া হয়েছে লভ্যাংশের হারে। কোনো কোম্পানি শেয়ারের অভিহিত মূল্যের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ নির্ধারণ করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদন লাগবে না। কিন্তু লভ্যাংশের হার ৫ শতাংশের বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। অংশগ্রহণমূলক বা পরিবর্তনশীল লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও এই অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এ জন্য কোম্পানিকে মনোনীত অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে যৌক্তিকতা তুলে ধরে আবেদন করতে হবে।
নির্দেশনায় বিনিয়োগের অর্থ দেশে আনা থেকে শুরু করে শেয়ার ইস্যুর পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। শেয়ার ইস্যুর ১৪ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। এর মধ্যে কোম্পানির সংঘস্মারক ও সংঘবিধি, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) কর্তৃক সত্যায়িত ফরম-১৫, বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনার সনদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিডিউল-এক্স থাকতে হবে।
শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি নিয়ম বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রেফারেন্স শেয়ার অভিহিত মূল্যেই ইস্যু করতে হবে। ফলে শেয়ার ইস্যু বা খালাসের সময় কোম্পানির আলাদা মূল্যায়নের প্রয়োজন হবে না। তবে এসব শেয়ারের সঙ্গে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরের সুযোগ থাকলে সাধারণ শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গত ৮ মার্চ জারি করা এফইআইডি সার্কুলার নং ০১-এ নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে রূপান্তরের অনুপাত ঠিক করতে হবে। রূপান্তর সম্পন্ন হলে কোম্পানিকে এডি ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়ে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনা মেনে প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করা হলে এবং প্রযোজ্য কর পরিশোধ করা থাকলে লভ্যাংশ কিংবা শেয়ার খালাসের অর্থ বিদেশে পাঠাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদন লাগবে না। তবে শেয়ার খালাসের অর্থ কিস্তিতে পাঠানো হলে প্রতিবার অর্থ পাঠানোর ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পরবর্তী প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর মধ্যে অনলাইন বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন শনাক্তকরণ নম্বরসংবলিত টিএম ফরমও থাকতে হবে।
অর্থ ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও দুটি শর্ত রয়েছে। যে এডি ব্যাংকের মাধ্যমে মূল বিনিয়োগ দেশে এসেছিল, লভ্যাংশ ও খালাসের অর্থও সেই ব্যাংকের মাধ্যমেই পাঠাতে হবে। একইভাবে, বিনিয়োগের অর্থ যে দেশ থেকে এসেছে, ফেরত পাঠানোর অর্থও সেই দেশেই পাঠাতে হবে। তবে প্রেফারেন্স শেয়ার থেকে পাওয়া লভ্যাংশ একই কোম্পানি কিংবা অন্য কোনো কোম্পানির সাধারণ শেয়ারে পুনর্বিনিয়োগ করা যাবে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ন্যায্য মূল্য বিবেচনায় নিতে হবে।
নতুন ব্যবস্থায় এডি ব্যাংকগুলোর ওপরও নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ ও বিনিয়োগ ফেরতের অর্থের বছরভিত্তিক হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। পাশাপাশি উৎসে কর কর্তন এবং বিদেশে পাঠানোর যোগ্য অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে নিরীক্ষকের সনদ রাখতে হবে। দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির আওতায় কর সুবিধা নিতে প্রয়োজনীয় নথি, গ্রাহকের পরিচিতি যাচাই এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত বিধিও মানতে হবে। মনোনীত এডি ব্যাংক পরিবর্তন করতে হলে আগের ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে এবং সব নথি নতুন ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও স্পষ্ট করেছে, যেসব প্রেফারেন্স শেয়ার পুরোপুরি সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য এবং যেগুলো নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে খালাসযোগ্য নয়, সেগুলোকে ইকুইটি মূলধন হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, শেয়ারের ধরন ও শর্তের ওপর নির্ভর করে বিদেশি বিনিয়োগের হিসাবায়নেও পার্থক্য থাকবে।
সাধারণ শেয়ারের তুলনায় প্রেফারেন্স শেয়ারে বিনিয়োগকারীর কিছু নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার থাকে। সাধারণত লভ্যাংশ পাওয়ার ক্ষেত্রে এবং কোম্পানি অবসায়িত হলে মূলধন ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা সাধারণ শেয়ারধারীদের আগে সুযোগ পান। তবে শেয়ারের শর্ত অনুযায়ী এসব সুবিধা ভিন্ন হতে পারে। নতুন নির্দেশনায় ইস্যু, রূপান্তর, খালাস এবং অর্থ ফেরত পাঠানোর নিয়ম নির্দিষ্ট হওয়ায় স্থানীয় কোম্পানির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ সংগ্রহের একটি বিকল্প কাঠামো তৈরি হলো। তবে এই সুযোগ কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ প্রস্তাব, শেয়ারের শর্ত এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ওপর।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ২০(৩) ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা সার্কুলারটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

