দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা কমানো এবং ব্যাংকগুলোর মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করতে একসঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (BAB) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (ABB)। এ লক্ষ্যে ব্যাংক মালিক ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ঋণ আদায় বাড়ানো, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সম্প্রসারণ এবং ব্যাংকিং খাতের নীতিগত সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি BAB-এর উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এতে BAB-এর চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকারসহ বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিরা এবং ABB-এর সদস্য ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা অংশ নেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দুই সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ব্যাংক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতা মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়া। এ ধরনের বৈঠক প্রতি তিন মাস অন্তর আয়োজনের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায় ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক চিত্র থেকেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে এর হার প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। বিপুল এই খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা, ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি এবং মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
বৈঠকে গভর্নর ব্যাংকগুলোর প্রতি খেলাপি ঋণ আদায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি ঋণ বিতরণ বাড়ানোর আহ্বান জানান। বিশেষ করে কৃষি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ঋণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগে সরকারি ট্রেজারি বিলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আর্থিক পণ্য তৈরির জন্য প্রতিটি ব্যাংকে গবেষণা সেল গড়ে তোলার পরামর্শও দেন। তাঁর মতে, ব্যাংকিং সেবাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে শুধু বড় করপোরেট ঋণের দিকে নজর না দিয়ে ছোট উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতেও অর্থায়ন বাড়াতে হবে।
গভর্নরের এই আহ্বানের পেছনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের দুর্বলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন। টানা সাত মাস ধরে এই প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকেও অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়েছিল। ফলে একদিকে খেলাপি ঋণ আদায় এবং অন্যদিকে নতুন উৎপাদনশীল ঋণ বিতরণ বাড়ানো, দুই ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
বৈঠকে BAB চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নীতিমালা, ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের জন্য কর্মদক্ষতা সূচক বা কেপিআই নির্ধারণ, প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন এবং বন্ধ কলকারখানা পুনরুজ্জীবনে অর্থায়নের উদ্যোগ। তবে তিনি ব্যাংকের লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম কিছুটা শিথিল করার এবং স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য নির্ধারিত ৭৫ বছর বয়সসীমা তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান।
বর্তমান নিয়মে কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার দুর্বলতা থাকলে, যেমন ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতির ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ কিংবা পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব, সেই ব্যাংকের লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সাল থেকে ধাপে ধাপে এ বিধিনিষেধ কঠোর করেছে। ২০২৫ সাল থেকে মোট ঋণের ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি থাকা ব্যাংক লভ্যাংশ দেওয়ার অযোগ্য হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা যুক্ত করা হয়। BAB-এর যুক্তি, লাভে থাকা ব্যাংকগুলোকে অন্তত সীমিত পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ দিলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখা সহজ হবে। তবে লভ্যাংশের নিয়ম শিথিল করা বা পরিচালকদের বয়সসীমা তুলে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন তথ্য বৈঠকসংক্রান্ত প্রতিবেদনে নেই।
বৈঠকে BAB-এর ভাইস চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান, রোমো রউফ চৌধুরী ও শরীফ জহিরসহ সংগঠনটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ABB-এর পক্ষ থেকে ইস্টার্ন ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা অংশ নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠকে ছিলেন।
তবে ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় শুধু নিয়মিত বৈঠক বা নীতিগত আলোচনা যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের সক্ষমতা যাচাই, ঋণের অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং ব্যাংকের পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে কৃষি ও এসএমই খাতে ঋণ বাড়াতে গিয়ে নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরির ঝুঁকি যেন না বাড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। তিন মাস অন্তর BAB, ABB ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এই যৌথ বৈঠকগুলো বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনার সিদ্ধান্তগুলো ব্যাংকগুলোর বাস্তব কার্যক্রমে কতটা প্রতিফলিত হয়, তার ওপর।

