বাংলাদেশে অবকাঠামো, পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরিতে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাগেরহাটের মোংলা বন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ সমঝোতা হয়। এর আওতায় চীনা প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতের সম্ভাব্য প্রকল্প ও বিনিয়োগের সুযোগ যাচাই করবে। সরকারের লক্ষ্য, শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং সেগুলোকে কেন্দ্র করে শিল্পকারখানা, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো। এতে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে।
সমঝোতা অনুযায়ী, সিআরসিসি এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবহন ও লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, রেল সরঞ্জাম সংযোজন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মতো খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করবে। পাশাপাশি রাসায়নিক, চিনি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইস্পাত এবং প্রকৌশল খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখার কথা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনা বিনিয়োগকারীদের যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ে সহায়তা দেবে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের জন্য এ উদ্যোগের গুরুত্ব কয়েকটি জায়গায়। প্রথমত, দেশের অবকাঠামো ও শিল্পায়নের জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শিল্পকারখানা স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ ও দক্ষ জনবলের ব্যবস্থা না থাকলে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও যদি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়া যায় কিংবা পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে, তাহলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে। ফলে অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পে একই সঙ্গে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে উৎপাদনব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো কাটানো সহজ হতে পারে।
সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বিভাগের সদস্য সালেহ আহমেদ এবং সিআরসিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসিইসিসি) চেয়ারম্যান লি চংইয়াং। অনুষ্ঠানে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, সিআরসিসির চেয়ারম্যান দাই হেগেন এবং সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম উপস্থিত ছিলেন। সিআরসিসি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। আয় ও ব্যবসার আকার বিবেচনায় ফরচুনের ২০২৬ সালের গ্লোবাল ৫০০ তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ৫৭তম। রেলপথ, সেতু, সড়ক, নগর পরিবহন ও বড় অবকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
তবে সমঝোতা স্মারক সই হওয়া মানেই নির্দিষ্ট প্রকল্পে বিনিয়োগ চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া নয়। কোন খাতে কত টাকা বিনিয়োগ হবে, প্রকল্প কোথায় বাস্তবায়িত হবে কিংবা কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। আপাতত সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য সম্ভাবনাময় প্রকল্প চিহ্নিত করা এবং বিনিয়োগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও সমন্বয় সহজ করা। অর্থাৎ এটি বিনিয়োগের দরজা খুলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে অর্থ আসা নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনা, সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়ন এবং প্রকল্প অনুমোদনের ওপর।
এই সমঝোতার সময় ও স্থানও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ আগে থেকেই চলছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের সেপ্টেম্বরের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে সিসিইসিসির সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে। সেখানে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও হালকা প্রকৌশল খাতে প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এটি বিনিয়োগের প্রস্তাবিত পাইপলাইন, নিশ্চিতভাবে বিনিয়োগ করা অর্থ নয়। নতুন সমঝোতার মাধ্যমে সেই বৃহত্তর বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবহন, জ্বালানি ও অন্যান্য শিল্প খাতের সংযোগ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আধুনিক কনটেইনার জেটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পে অর্থায়নের বড় অংশ আসছে চীন থেকে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার সহজ শর্তের ঋণ দেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থের জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটির নির্মাণকাজের ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে সিসিইসিসি, যা সিআরসিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ নতুন সমঝোতার বাইরেও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে চীনা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি অংশগ্রহণ রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১০ ও ১১ নম্বর দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ করা হবে। জেটি দুটির সম্মিলিত দৈর্ঘ্য হবে ৩৬৮ মিটার। পাশাপাশি আধুনিক কনটেইনার ইয়ার্ড, বিপজ্জনক পণ্য রাখার জায়গা এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। সব কাজ শেষ হলে নতুন স্থাপনাগুলো থেকে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। বর্তমানে মোংলা বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ তুলনামূলক কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটিতে ২৯ হাজার ৭০০ টিইইউ কনটেইনার ওঠানামা করেছে। ফলে নতুন অবকাঠামো দিয়ে শুধু সক্ষমতা তৈরি করলেই হবে না, সেই সক্ষমতা ব্যবহার করার মতো পণ্য ও জাহাজও আকর্ষণ করতে হবে।
মোংলা বন্দরের অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুবিধা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও কৃষিপণ্য পরিবহনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোরের মতো জেলাগুলোতে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে আমদানি করা কাঁচামাল আনা এবং উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির জন্য বন্দরের চাহিদা বাড়বে। একইভাবে বন্দরের আশপাশে শিল্পাঞ্চল তৈরি হলে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব ও খরচ কমানোর সুযোগ থাকবে। এতে নতুন কারখানা, গুদাম, পরিবহন, জাহাজ পরিচালনা এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
তবে মোংলা বন্দরের সামনে এখনো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পশুর চ্যানেলের নাব্যতা ঠিক রাখা, সারা বছর নিরাপদে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা, বন্দরের সেবায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করা জরুরি। শুধু জেটি নির্মাণ করলেই একটি বন্দর আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে না। জাহাজের অপেক্ষার সময়, পণ্য খালাসের খরচ, কাস্টমসের কাজ শেষ করার গতি এবং বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার কমলাপুর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো থেকে সরাসরি কনটেইনারবাহী ট্রেন মোংলা পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এ ক্ষেত্রে বড় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে মোংলা থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো গড়ে তোলার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ শিল্পকারখানায় নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন।
সব মিলিয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও সিআরসিসির সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিশেষ করে মোংলা বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন অবকাঠামোকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সমঝোতার পর দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই, নির্দিষ্ট প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগ বাস্তবায়নের বাধাগুলো দূর করতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা বিনিয়োগের আগ্রহের প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে তার প্রকৃত সুফল আসে তখনই, যখন কারখানা তৈরি হয়, উৎপাদন শুরু হয়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কাজ পায় এবং মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

