নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে চালু হওয়া বাংলা কিউআর উদ্যোগ এখন অনেকটাই থমকে গেছে। শুরুর দিকে লেনদেনের গতি আশাজাগানিয়া হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাতে স্পষ্ট ভাটা পড়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এ অবস্থায় নতুন কোনো উদ্যোগ ছাড়া শিগগিরই লেনদেন বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যেই চলতি মাস থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেনেও বাংলা কিউআর কোডের সেবা চালু হয়েছে। অর্থাৎ সেবাটির পরিধি বাড়লেও লেনদেনের প্রবাহ বাড়ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গত মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার লেনদেন হতো। পরের কয়েক মাসে তা দ্রুত বেড়ে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দৈনিক ১৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু এরপরই নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে দৈনিক লেনদেন নেমে আসে ১১৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শীর্ষ অবস্থান থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, গত ২৪ সপ্তাহের মধ্যে ৭ সপ্তাহেই কিউআর লেনদেনের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ছিল। অর্থাৎ ওই সময়গুলোতে আগের সপ্তাহের তুলনায় লেনদেন কমেছে।
লেনদেন কমার কারণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলা কিউআরে লেনদেনের গতি কেন কমল, তা তাঁরাও বুঝতে পারছেন না। তাঁর ভাষ্য, বাধা দূর করে লেনদেন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে এবং বাংলা কিউআরকে সর্বজনীন করতে প্রয়োজনে আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ও এর প্রভাবই এই মন্দার বড় কারণ হতে পারে।
গত জুলাইয়ে লেনদেনে বাংলা কিউআর কোডের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) নিজস্ব কোডের বদলে পণ্য ও সেবা বিক্রেতাদের (মার্চেন্ট) কাছে বাংলা কিউআর কোড স্থাপন করে। অনেক ক্ষেত্রে একই মার্চেন্টের এক ব্যাংক বা এমএফএস হিসাবের বিপরীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চার-পাঁচটি পর্যন্ত কোড দেওয়া হয়েছে। গ্রামগঞ্জের ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে বড় বড় বিক্রয়কেন্দ্র, সবাই এই মার্চেন্ট তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
সমস্যার সূত্রপাত এখান থেকেই। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব মার্চেন্ট ধীরে ধীরে নগদ টাকা তোলার বিকল্প মাধ্যম হয়ে ওঠেন। এর প্রভাবে চাপে পড়ে এমএফএস এজেন্টনির্ভর কাঠামো।
অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআরের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণে বিক্রেতাদের খরচ শূন্যে নামিয়ে আনে। ফলে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া কিংবা নগদে তা ফেরত দিতে মার্চেন্টদের কোনো মাশুল দিতে হয় না। অন্যদিকে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো সেবায় এজেন্টের মাধ্যমে ক্যাশ আউট করলে নির্দিষ্ট হারে ফি দিতে হয়। এই ফির একটি অংশ হিসেবে প্রতি হাজার টাকায় তিন টাকার বেশি রাজস্ব পায় সরকার। কিন্তু মার্চেন্টের মাধ্যমে টাকা তুললে কোনো খরচ নেই, সরকারও কোনো রাজস্ব পায় না।
ফলে কিউআর কোড ব্যবহার করে মার্চেন্টের কাছ থেকে নগদ তোলা গ্রাহক ও মার্চেন্ট, দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক হয়ে ওঠে। আর সরকার ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে ৩০ সেপ্টেম্বর কঠোর অবস্থান নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা ঘোষণা দেয়, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর স্বার্থে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে কোনো অর্থ উত্তোলন হলে সংশ্লিষ্ট হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর থেকে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো কেনাকাটার পরিবর্তে অর্থ উত্তোলনের লেনদেন শনাক্ত হলেই হিসাব বন্ধ করছে। খাতসংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ, এরপর থেকেই কিউআর লেনদেনের গতি কমতে শুরু করে।
লেনদেন বাড়াতে সরকারের দিক থেকে প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বাংলা কিউআরে লেনদেন বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দিতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ব্যক্তিপর্যায়ে নিবন্ধিত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বিক্রেতা কিংবা সেবাপ্রদানকারীদের দোকানে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে এই সুবিধা মিলছে।
এই ব্যবস্থায় মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর কোড স্থাপনকারী ও লেনদেন গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান (একুয়ারিং প্রতিষ্ঠান) লেনদেনের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাচ্ছে। আর যে ব্যাংক বা এমএফএসের মাধ্যমে গ্রাহক টাকা পরিশোধ করছেন, সেই ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে লেনদেনের শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা। এত কিছুর পরও লেনদেন প্রত্যাশামতো বাড়ছে না।
খাতসংশ্লিষ্টরা এই স্থবিরতার পেছনে প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত বেশ কিছু দুর্বলতাকে দায়ী করছেন। তাঁদের মতে, দেশের নাগরিকদের বড় একটি অংশ এখন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশ ও নগদের গ্রাহক। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলা কিউআরকে জনপ্রিয় করা কঠিন হবে। এ ছাড়া গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ব্যাংকিং অ্যাপগুলোকে আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা জরুরি। ইন্টারনেট ছাড়া বাংলা কিউআর অ্যাপ ব্যবহারের যে ঘোষণা আগে দেওয়া হয়েছিল, সেটিও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন। বর্তমানে নতুন মার্চেন্ট হিসাব খোলার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে ইসলামী, পূবালী, জনতা, সোনালী ও রূপালী ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান বলেন, বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে তাঁরা কর্মীদের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছেন। এতে নিয়মিত নতুন হিসাব খোলা হচ্ছে এবং লেনদেনও বাড়ছে। তাঁর মতে, সবাই এগিয়ে এলেই সেবাটির প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।
সব মিলিয়ে বাংলা কিউআরের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে নগদ উত্তোলনের ফাঁক বন্ধ করে প্রকৃত কেনাকাটায় লেনদেন বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও বড় মোবাইল ব্যাংকিং সেবাগুলোর সীমিত অংশগ্রহণ। এসব বাধা কাটাতে না পারলে ডিজিটাল লেনদেনের এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতি পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

