ব্যাংকে এফডিআর করলে কত সুদ পাবেন, সেটা হিসাব করা সহজ। কিন্তু সেই সুদ পাওয়ার পর আপনার টাকার ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ল, সেই হিসাবটা একটু ভিন্ন। কারণ ব্যাংক থেকে পাওয়া পুরো সুদ আপনার হাতে আসে না। এর ওপর আছে কর, আবগারি শুল্ক এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব। সব হিসাব শেষে দেখা যেতে পারে, কাগজে আপনার টাকা বাড়লেও বাস্তবে সেই টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম পণ্য কিনতে পারছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ছয় মাস মেয়াদি এফডিআরে সর্বোচ্চ সুদের হারের গড় ছিল ৯.৪৬ শতাংশ। ব্যাংকভেদে এই হার সাড়ে ৭ শতাংশের কিছু বেশি থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। তবে মনে রাখতে হবে, এটি ব্যাংকগুলোর দেওয়া সর্বোচ্চ হারের গড়। সব গ্রাহক এই হারে এফডিআর করার সুযোগ পান না। অন্যদিকে, জুন মাসে সব ব্যাংকের আমানতের ওপর ভারিত গড় সুদের হার ছিল ৬.১৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকের বিজ্ঞাপনে যে সুদের হার দেখা যায়, বাস্তবে সব আমানতকারী গড়ে সেই হারে সুদ পান না।
কাগজে যে মুনাফা দেখছেন, বাস্তবে তার চেয়ে কম
চলুন প্রথমে সুদের সাধারণ হিসাবটি বোঝার চেষ্টা করি। সরল সুদের ক্ষেত্রে মূল টাকা, বার্ষিক সুদের হার এবং সময় গুণ করলেই পাওয়া যায় মোট সুদ। যেমন, আপনি যদি ১০ লাখ টাকা এক বছরের জন্য ৯ শতাংশ সুদে রাখেন, তাহলে বছর শেষে সুদ পাবেন ৯০ হাজার টাকা।
কিন্তু ব্যাংক যদি প্রতি তিন মাস বা ছয় মাস পরপর সুদ মূল টাকার সঙ্গে যোগ করে, তাহলে হিসাবটা বদলে যায়। একে বলে চক্রবৃদ্ধি সুদ। অর্থাৎ আগের সময়ে পাওয়া সুদের ওপরও পরবর্তী সময়ে সুদ যোগ হয়। ধরুন, ১০ লাখ টাকা ৯ শতাংশ সুদে রাখলেন এবং প্রতি তিন মাস পরপর সুদ মূল টাকার সঙ্গে যুক্ত হলো। তাহলে বছর শেষে কার্যকর সুদের হার দাঁড়াবে প্রায় ৯.৩১ শতাংশ। সে হিসাবে ১০ লাখ টাকায় সুদ পাওয়া যাবে প্রায় ৯৩ হাজার টাকা।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। এই হিসাব কর কাটার আগের। বাস্তবে ব্যাংক সুদ দেওয়ার সময়ই উৎসে কর কেটে রাখে। ফলে পুরো সুদ আবার মূল টাকার সঙ্গে যোগ করার সুযোগ সব ক্ষেত্রে থাকে না। অর্থাৎ কাগজে যে পরিমাণ মুনাফা দেখছেন, বাস্তবে হাতে পাওয়া টাকা তার চেয়ে কম হতে পারে।
সুদ থেকে কে কত কেটে নেয়
আয়কর আইন ২০২৩-এর ১০২ ধারা অনুযায়ী, ব্যাংক আমানতের সুদ দেওয়ার সময়ই উৎসে কর কেটে রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংকও গত আগস্টে সব ব্যাংককে সঠিক হারে কর কাটতে এবং সেই অর্থ সময়মতো সরকারি কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
সাধারণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ১০ শতাংশ। তবে আয়কর আইন ২০২৩-এর ১৪২ ধারা অনুযায়ী, রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে না পারলে ব্যাংককে নির্ধারিত হারের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি কর কাটতে হয়। অর্থাৎ ১০ শতাংশের পরিবর্তে কর দিতে হয় ১৫ শতাংশ। আমার মতে, এফডিআর করার আগে এই বিষয়টি জানা খুবই জরুরি।
ধরা যাক, আপনার ১০ লাখ টাকার এফডিআরে বছরে ৯০ হাজার টাকা সুদ হলো। ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটলে ৯ হাজার টাকা চলে যাবে। আপনার হাতে থাকবে ৮১ হাজার টাকা। কিন্তু রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে না পারলে ১৫ শতাংশ হারে কর কাটা হবে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। তখন হাতে পাবেন ৭৬ হাজার ৫০০ টাকা। শুধু রিটার্ন জমার প্রমাণ না দেখানোর কারণে বছরে আপনার ৪ হাজার ৫০০ টাকা কমে যাচ্ছে।
এর বাইরে ব্যাংকে নির্দিষ্ট সীমার বেশি টাকা জমা থাকলে বছরে একবার আবগারি শুল্কও কাটা হয়। এবারের বাজেটে এই শুল্কের আওতামুক্ত আমানতের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার ঘোষণা এসেছে। এর বেশি আমানত থাকলে ধাপ অনুযায়ী ৫০০ টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত শুল্ক কাটার বিধান রয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের চূড়ান্ত কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আমি আলাদা কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন পাইনি। তাই নিজের ব্যাংক থেকে বিষয়টি জেনে নেওয়াই ভালো।
টাকার ক্রয়ক্ষমতা কি বাড়ছে?
এবার আসল হিসাব। ১০ লাখ টাকার এফডিআরে ৯ শতাংশ সুদ পেয়ে কর কাটার পর হাতে থাকল ৮১ হাজার টাকা। অর্থাৎ আপনার নিট আয়ের হার ৮.১ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে পণ্যের দাম যদি ৮.৩৪ শতাংশ বেড়ে যায়, তাহলে আপনার টাকার ক্রয়ক্ষমতা আগের জায়গায় থাকছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের শুরুতে যে পণ্য কিনতে ১০ লাখ টাকা লাগত, বছর শেষে একই পণ্য কিনতে প্রয়োজন হবে ১০ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ আপনার এফডিআরের টাকা ও সুদ মিলিয়ে হয়েছে ১০ লাখ ৮১ হাজার টাকা। অর্থাৎ সুদ পাওয়ার পরও আগের সমপরিমাণ পণ্য কিনতে আপনার প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা ঘাটতি থাকছে।
অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় প্রকৃত আয় বা প্রকৃত সুদের হার। এর হিসাব করতে ফিশার সমীকরণ ব্যবহার করা হয়। সহজভাবে বললে, কর কাটার পর পাওয়া সুদের হারকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যায় টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, নাকি কমছে। এই হিসাবে ১০ শতাংশ কর কাটার পর প্রকৃত আয় দাঁড়ায় মাইনাস ০.২২ শতাংশ। আর ১৫ শতাংশ কর কাটা হলে তা নেমে আসে মাইনাস ০.৬৪ শতাংশে। অন্যদিকে, ব্যাংকের আমানতের গড় সুদের হার ৬.১৬ শতাংশ ধরে ১০ শতাংশ কর বাদ দিলে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর প্রকৃত আয় দাঁড়ায় মাইনাস ২.৫৮ শতাংশ।
এখানে আমার একটু হিসাব করলে বুজতে পারবো, মূল্যস্ফীতি যদি ৮.৩৪ শতাংশ থাকে, তাহলে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটার পরও টাকার ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে এফডিআরে অন্তত ৯.২৭ শতাংশ সুদ প্রয়োজন। আর করের হার ১৫ শতাংশ হলে প্রয়োজনীয় সুদের হার হবে প্রায় ৯.৮১ শতাংশ। অথচ অনেক ব্যাংকেই এফডিআরের সুদ এই সীমার নিচে। ফলে অনেক আমানতকারীর হিসাবে টাকা বাড়লেও বাস্তবে সেই টাকার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না।
যে কারনে লম্বা মেয়াদে হিসাবটা বদলায়
তাহলে কি ব্যাংকে টাকা রাখা লাভজনক নয়? বিষয়টি এত সরল নয়। বরং কত দিন টাকা রাখছেন এবং সুদ কীভাবে জমা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে দীর্ঘ সময়ে মুনাফার পরিমাণ বাড়ে।
ধরুন, কর কাটার পর আপনার নিট সুদের হার ৮.১ শতাংশ। প্রতি বছর এই সুদ মূল টাকার সঙ্গে যোগ হলে ১০ লাখ টাকা তিন বছর পর বেড়ে হবে প্রায় ১২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। কিন্তু একই হারে সরল সুদের হিসাবে তিন বছর পর টাকা হবে ১২ লাখ ৪৩ হাজার। অর্থাৎ চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে বাড়তি পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া টাকা কত সময়ে দ্বিগুণ হতে পারে, তার একটি সহজ হিসাব আছে। একে বলা হয় ৭২-এর নিয়ম। ৭২-কে বার্ষিক নিট সুদের হার দিয়ে ভাগ করলে আনুমানিক বোঝা যায় কত বছরে টাকা দ্বিগুণ হবে। আপনার নিট সুদের হার যদি ৮.১ শতাংশ হয়, তাহলে ৭২-কে ৮.১ দিয়ে ভাগ করলে সময় পাওয়া যায় প্রায় ৯ বছর। তবে এই হিসাব শুধু টাকার অঙ্ক দ্বিগুণ হওয়ার কথা বলে, ক্রয়ক্ষমতা দ্বিগুণ হওয়ার কথা নয়। মূল্যস্ফীতি একই হারে চলতে থাকলে আপনার প্রকৃত সম্পদ বাড়ার গতি অনেক কম হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদের হার ৯.৫ শতাংশে রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য, আগেভাগে সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আবার বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, ২৯ জুন থেকে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পয়েন্টের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জুনে এই ব্যবধান ছিল ৫.৭০ শতাংশ পয়েন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, এতে ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদ কমানোর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই দীর্ঘ মেয়াদে বর্তমান সুদের হার ধরে রাখতে চাইলে এফডিআর করার সময় মেয়াদ ও শর্তগুলো ভালোভাবে বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
সুদের চেয়েও বড় প্রশ্ন: টাকাটা কতটা নিরাপদ
এতক্ষণ আমরা সুদ ও মুনাফার হিসাব করলাম। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন আছে। যে ব্যাংকে টাকা রাখছেন, সেখানে আপনার আসল টাকা কতটা নিরাপদ? কারণ বেশি সুদ পেলেও মূল টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে সেই মুনাফার কোনো অর্থ থাকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২.৭৮ শতাংশ। এ অবস্থায় কোন ব্যাংকে টাকা রাখছেন, সেটি শুধু সুদের হার দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। এ বছরের আমানত সুরক্ষা আইনে প্রতি আমানতকারীর সুরক্ষার সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে লিকুইডেটর ১০ কর্মদিবসের মধ্যে আমানতকারীদের তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেবেন। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সুরক্ষিত অর্থ পরিশোধ করবে। এই সীমার বেশি টাকা থাকলে বাকি অর্থের জন্য লিকুইডেটরের কাছে দাবি জানাতে হবে।
তাই আমার পরামর্শ, বড় অঙ্কের টাকা একটি ব্যাংকে না রেখে বিভিন্ন ব্যাংকে ভাগ করে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করুন। ব্যাংক বাছাইয়ের সময় শুধু কে বেশি সুদ দিচ্ছে, সেটি না দেখে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ দিন শেষে এফডিআরের আসল উদ্দেশ্য শুধু কিছু সুদ পাওয়া নয়, নিজের সঞ্চয়ের মূল্য ধরে রাখা এবং টাকাটি নিরাপদে রাখা। সুদ যতই বেশি হোক, আসল টাকা ঝুঁকিতে থাকলে সেই লাভের কোনো মানে নেই।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

