বাংলাদেশের ২ কোটি ৬০ লাখ শিশুর প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ৩০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। শিশুদের পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জনের ওপর এই কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। গতকাল শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদ এ অর্থায়নের অনুমোদন দেয়।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সরকারের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে সহায়তার অংশ হিসেবে ‘লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকসেলারেশন ইন প্রাইমারি এডুকেশন’ নামের এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিখনফল উন্নত করা, পাঠদান ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া শিশুদের বাড়তি সহায়তা দেওয়া।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় শতভাগ শিশুর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও শিক্ষার মান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১০ বছর বয়সী প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু বয়সোপযোগী সহজ কোনো লেখা পড়ে বুঝতে পারে না। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ মালয়েশিয়ায় এ হার ৪২ শতাংশ, ব্রাজিলে ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের অবস্থা এ দুই দেশের চেয়েও পিছিয়ে। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় দুই কোটির বেশি শিশু প্রাথমিক শিক্ষা নিচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জঁ পেম বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম কর্মশক্তি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। তাঁর ভাষ্য, গত দুই দশকে প্রায় সব শিশুকে বিদ্যালয়ে আনতে সহায়তা করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। নতুন এই অর্থায়ন শিশুদের আরও ভালোভাবে শিখতে ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে। এতে ভবিষ্যতে উন্নত কর্মসংস্থানের ভিত্তি তৈরি হবে।
কর্মসূচির আওতায় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, কাঠামোবদ্ধ পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা শিশুদের মৌলিক দক্ষতা গড়ে তোলায় আরও কার্যকরভাবে পাঠদান করতে পারেন। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ প্রধান শিক্ষককে নেতৃত্ববিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা হবে।
পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া শিশুদের ঘাটতি কাটাতে বিশেষ শিখন সহায়তাও থাকছে। এ ক্ষেত্রে যেসব জেলায় শিক্ষার্থীদের শিখনফল সবচেয়ে দুর্বল, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও কর্মসূচির দলনেতা তাসমিনা রহমান বলেন, ভালো কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে মৌলিক শিক্ষায় শক্ত ভিত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই পিছিয়ে থাকা শিশুদের বিশেষ সহায়তা দেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, এই উদ্যোগে শিক্ষকদের দক্ষতা ও বিদ্যালয়ের নেতৃত্বের মানোন্নয়ন, বাজেট ব্যবহারে জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্য-উপাত্তের কার্যকর ব্যবহারেও সহায়তা মিলবে।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নও হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে শিশুরা মৌলিক দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এ কর্মসূচির ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আরও ৮ লাখ ৪৩ হাজার উন্নত ও বেশি বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তহবিল আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে এই অর্থায়ন দেওয়া হচ্ছে। পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণের মেয়াদ ২৫ বছর। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সাফল্যের পর এখন শেখার মান নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই ঋণের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছায় এবং শিশুদের পড়ার দক্ষতা কতটা বাড়ে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

