দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এখন গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে। লাগামহীন খেলাপি ঋণের চাপে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত নড়বড়ে হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে প্রভিশন ঘাটতিও। এক বছরের ব্যবধানে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকায়।
ব্যাংকিং খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, করপোরেট গভর্ন্যান্সের ব্যর্থতা এবং ঋণ বিতরণে দীর্ঘদিনের অনিয়ম। জাল জালিয়াতি ও ভূয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নামে-বেনামে কয়েক লাখ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে তৎকালীন স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট একটি গোষ্ঠীর ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। এর ফলে একসময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী এই ব্যাংকটি তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে।
স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ১৬ মাসের বেশি সময় পার হলেও ইসলামী ব্যাংক এখনো খেলাপি ঋণের চাপ থেকে বেরোতে পারেনি। বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে এই ব্যাংকটি।
খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন ঘাটতি বাড়া অবশ্যম্ভাবী। মন্দ ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ না করলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়। তাদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি কমাতে হলে আগে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এজন্য ঋণ বিতরণের সময় কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে বিতরণ করা অর্থ সময়মতো আদায় করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি এখন অনাদায়ী।
মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সে সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।
এর আগেও খেলাপি ঋণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৩২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অর্থাৎ নয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, বা মোট ঋণের ১১ শতাংশ। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮৮ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণের এই চাপে ইসলামী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতিও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। মন্দ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই পরিস্থিতি নিয়ে জানতে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর একে একে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের বিষয়গুলো সামনে আসে। উচ্চ খেলাপি ঋণের ভারে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে একাধিক ব্যাংক কার্যত খুঁড়িয়ে চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৪ সালের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৫৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে যেখানে মাত্র ১০টি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি ছিল, সেখানে বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪টিতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতিতে ইসলামী ব্যাংকের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এই ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৫২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, যার প্রভিশন ঘাটতি ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। চতুর্থ স্থানে ন্যাশনাল ব্যাংক, ঘাটতি ২৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। পঞ্চম স্থানে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক, যার ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক ব্যাংক জোরপূর্বক দখলে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় লুটপাটের মহোৎসব। জাল জালিয়াতি ও ভূয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয় বিপুল অঙ্কের অর্থ। এর ফলেই ইসলামী ব্যাংকসহ দুই ডজনের বেশি ব্যাংক আজ আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এরপর পেশীশক্তি ও প্রভাব খাটিয়ে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ লুট করা হয়।

