সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিনের ভয় ও অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, সেই থেকে মানুষ ধীরে ধীরে আবার ব্যাংক খাতে ফিরছে। একসময় আতঙ্কে তুলে নেওয়া নগদ টাকা এখন ব্যাংকে জমা পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে মুদ্রাবাজারে, যেখানে নগদ টাকার সরবরাহ সাম্প্রতিক মাসে কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছরের (২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবর মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা কমেছে ৪ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা, যা অক্টোবর মাসে নেমে এসেছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার এই পতন মূলত মানুষের আস্থা ফিরে আসারই ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ কমে আসার মানে হলো গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে। কিছু কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে টাকা তুলেছিল। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। ভয় কেটে যাওয়ায় মানুষ আবার ব্যাংকে টাকা রাখছে।”
পরিসংখ্যানও বিষয়টি পরিষ্কার করে দেখাচ্ছে। গত এক বছরে নগদ টাকার ওঠানামার প্রবণতা ছিল লক্ষ্যনীয়। ২০২৪ সালের জুনে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। জুলাইয়ে তা কমে হয় ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি, আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি, সেপ্টেম্বর কমে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি, অক্টোবর ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি, নভেম্বর ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ কোটি এবং ডিসেম্বর ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি টাকায়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নগদ টাকা কমে ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩৯ কোটি এবং ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকায় নেমেছিল। এরপর ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ বাড়া-কমার মধ্য দিয়ে জুন পর্যন্ত পৌঁছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায়। কিন্তু এরপর ফের নগদ টাকার প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, যা জুলাইয়ে নেমে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি এবং আগস্টে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটিতে দাঁড়ায়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “মানুষের হাতে থাকা টাকা ব্যাংকে ফিরে আসা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। টাকা ঘরে থাকলে বিনিয়োগ হয় না, বিনিয়োগ না হলে অর্থনীতির গতি বাড়ে না। ব্যাংকে টাকা ফিরলে তা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করে।” তিনি সতর্ক করে যোগ করেন, “এই আস্থা ধরে রাখতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, ভুয়া ঋণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।”
নগদ টাকার সঙ্গে মুদ্রা সরবরাহেও কিছুটা সংকোচন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকার স্থিতি বা রিজার্ভ মানি ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ১৯৬ কোটি ৪ লাখ টাকা। অক্টোবর মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৮৮৭ কোটি ৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে রিজার্ভ মানি কমেছে ৭ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা।

