বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বাজারে একটি নির্দিষ্ট সীমা ধরে রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছে। এর ফলে আন্তঃব্যাংক ও রেমিট্যান্স—দুই ক্ষেত্রেই ডলারের দামে একটি সর্বোচ্চ সীমা কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার বিক্রির সর্বোচ্চ দর ১২২.৭০ টাকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে রেমিট্যান্স কেনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দর নির্ধারণ করা হয়েছে ১২২.৯০ টাকা। এছাড়া ব্যাংকগুলোর বিলস ক্লিন (বিসি) রেট কমানোর দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে। এর আগে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার বিক্রির হার ছিল ১২৩.২৫ থেকে ১২৩.৫০ টাকার মধ্যে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক এক বৈঠক। গত সপ্তাহে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের আলোচনায় উঠে আসে, কিছু ব্যাংক বেশি দামে রেমিট্যান্স কিনছে। এরপরই বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ব্যাংকারদের মতে, বর্তমানে ডলার বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে স্বাভাবিকভাবেই, বড় ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। ব্যাংকগুলোর নিট ওপেন পজিশনও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। তাই ডলারের দাম বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
একই ধরনের মত দিয়েছেন অন্য ব্যাংকাররাও। তাদের ভাষ্য, কিছু ব্যাংক অতিরিক্ত দামে ডলার কেনায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমানে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো এবং ডলারের সরবরাহও পর্যাপ্ত, ফলে অতিরিক্ত দামে কেনাবেচার প্রয়োজন নেই।
তবে একটি চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে। যেসব ব্যাংক আগে ১২৩ টাকা বা তার বেশি দামে রেমিট্যান্স কিনেছে, তারা এখন কম দামে আন্তঃব্যাংক বাজারে বিক্রি করতে অনাগ্রহী হতে পারে। এতে বাজারে ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও ডলার বাজারে প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রবাসী আশঙ্কা থেকে আগেভাগেই অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। এর ফলে মার্চ মাসে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রেমিট্যান্স এসেছে, যা একটি রেকর্ড।
তবে ব্যাংকারদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। সেই ঝুঁকি মাথায় রেখে অনেক ব্যাংক ও ব্যবসায়ী ফরওয়ার্ড বুকিং বাড়াচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা আগেই একটি নির্দিষ্ট দামে ভবিষ্যতের ডলার লেনদেন নিশ্চিত করছেন, যাতে পরবর্তীতে দামের ঊর্ধ্বগতির ঝুঁকি কমানো যায়।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত ফরওয়ার্ড বুকিং নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে ডলার কিনে তা ফরওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক মাস আগেও ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের চাহিদা কম ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই এই প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে স্পট মার্কেটে ডলারের চাহিদা কিছুটা কমেছে।
একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। ডলারের দাম সহনীয় পর্যায়ে ধরে রাখতে পারলে আমদানি ব্যয় ও জ্বালানির দামের চাপও কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। তার মতে, এই মৌখিক নির্দেশনাকে ‘ভার্বাল ইন্টারভেনশন’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ সবসময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক বেশি দামে ডলার কিনেছে, তারা লোকসান দিয়ে কম দামে বিক্রি করতে চাইবে না—এ বিষয়টি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

