একটি নতুন গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, কার্বন নিঃসরণ কমানো না হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রায় ৫ শতাংশ অতিরিক্ত কার্বন কর আরোপ হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। সরবরাহ চেইনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য সম্প্রতি তারা চালু করেছে কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম)। এই কাঠামোর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতও আসতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান কার্বন নিঃসরণের হার বজায় থাকলে ২০৩০ সালের পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ৪.৮ শতাংশ অতিরিক্ত কার্বন কর লাগতে পারে। এই তথ্য এসেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও মোহাম্মদ ইমরাজ কবিরের যৌথ গবেষণায়। ২৯ মার্চ সিপিডির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনের প্রকাশিত হয়।
অতিরিক্ত এই কর এমন এক সময়ে আসছে, যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা হারানোর কারণে ইউরোপের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারাচ্ছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে। কার্বন করের ৪.৮ শতাংশ যুক্ত হলে মোট শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ১৭ শতাংশ।
“ইইউ কার্বন ট্যাক্স: পসিবল ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশস অ্যাপারেল এক্সপোর্ট” শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইইউ-সিবিএএমের আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৪.৮ শতাংশ কার্বন কর বসতে পারে। যদি ইইউর এমএফএন শুল্ক ১২.১ শতাংশ ধরা হয়, তবে মোট আমদানি শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ১৬.৯ শতাংশ।
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হতে পারে। এমনকি ইইউ যদি ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা বাড়িয়ে দেয়, তবু তৈরি পোশাক খাতকে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে সিবিএএমের আওতায় অন্তত ৪.৮ শতাংশ কর দিতে হতে পারে।
সিপিডির অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের পোশাক খাতের কার্বন নিঃসরণ অনুযায়ী আমরা প্রাক্কলন করেছি এবং এই হিসাব পেয়েছি।” তবে উদ্যোক্তারা আতঙ্কিত নন। তারা বলছেন, অনেক কারখানা ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারসহ পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বাকি কারখানাগুলোও ধাপে ধাপে যুক্ত হবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই ইইউর শর্ত অনুযায়ী উৎপাদনে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করার প্রস্তুতি শুরু করেছি। বেশ কিছু কারখানা ইতিমধ্যে পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়া চালু করেছে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোও সরকারের সঙ্গে কাজ করছে যেন শর্ত পূরণ করতে পারে।”
বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব কারখানার দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০০টি ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল স্বীকৃত গ্রিন কারখানা রয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বিদ্যমান কারখানাগুলো ইইউর সব শর্ত পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও এটি বড় অগ্রগতি।”
ইইউ ২০২১ সালের জুলাইয়ে সিবিএএম চালু করে। প্রথমে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিমেন্ট, সার ও ইস্পাত পণ্যে প্রযোজ্য হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সব পণ্যের জন্য এটি কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পাঁচ ভাগের চার ভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এর অর্ধেকের বেশি রপ্তানি যায় ইউরোপে। তাই নতুন এই নিয়ম দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, কার্বন কর এড়াতে বাংলাদেশকে উৎপাদনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রস্তাবিত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে:
- জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি আমদানিতে শুল্ক কমানো,
- ইটিপি স্থাপনে ভর্তুকিযুক্ত ঋণ,
- কার্বন নিঃসরণ কমানোর নীতিমালা বাস্তবায়ন,
- প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি,
- সিবিএএম প্রভাব পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা,
- ডব্লিউটিওর সঙ্গে আলোচনা চালানো,
- দেশীয় কার্বন প্রাইসিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি জোরদার করা।
এছাড়া বলা হয়েছে, সিবিএএম যেন কোনোভাবেই উন্নত দেশের বাণিজ্য সুরক্ষাবাদী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

