সবজি, মুরগি, ভোজ্যতেল ও চিনি সহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। অনেক ক্রেতা দাম বেড়ে যাওয়ায় পছন্দের পণ্য থেকে সরে এসে তুলনামূলক কম দামের পণ্য কিনছেন। কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে কেনাকাটা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমেছে। তবে ক্রেতাদের মধ্যে ‘দাম আরও বাড়তে পারে’ বা ‘সংকট আসতে পারে’–এ ধরনের ভীতির কারণে অতিরিক্ত কেনাকাটা হচ্ছে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগে দাম আরও বাড়াচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, মজুতের বিষয়ে জনগণকে তথ্য দেওয়া এবং দেশীয় উৎপাদনের সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রেখে মধ্যস্বত্বভোগীর অতিরিক্ত দৌরাত্ম্য কমানো না হলে সংকট সহজে কাটবে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দাবি করেছে, মার্চে মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারির তুলনায় কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমেছে। ফেব্রুয়ারিতে এটি ৯ শতাংশের বেশি ছিল। অর্থাৎ পণ্যের দাম কমছে, কিন্তু বাস্তবে বাজারে অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে ৬ মার্চের পর জ্বালানি তেলের রেশনিং ঘোষণার পর থেকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা:
ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও, কারওয়ান বাজার ও মহাখালী কাঁচাবাজারে খোলা সয়াবিনের লিটার বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায়। পাম অয়েলের লিটার বিক্রি হয়েছে ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায়। এক মাস আগে এর দাম যথাক্রমে ১৭৫–১৮০ ও ১৬৫–১৭০ টাকা ছিল।
সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে সয়াবিনের দাম ১৪–১৯ টাকা ও পাম অয়েলের দাম ১৮–১৯ টাকা বেশি। কিছু জায়গায় বোতলভিত্তিক দামেও বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চিনির বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ঈদের আগে খোলা চিনির কেজি ছিল ৯৫–১০০ টাকা, এখন বেড়ে ১০০–১০৫ টাকা।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে। এই সব কারণে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বাড়ছে।
মুরগি ও গরুর মাংসের বাজারে চাপ:
সোনালি মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০–৪৩০ টাকায়। রোজার মাঝামাঝি সময়ের দাম ছিল ২৭০–৩০০ টাকা। ঈদের সপ্তাহখানেক আগে দাম বেড়ে ৩৪০–৩৭০ টাকায় পৌঁছায়। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০–১৮০ টাকায়, লেয়ার মুরগি ৩৪০–৩৫০ টাকায়।
সোনালি মুরগির দাম বেড়ে যাওয়ায় গরুর মাংসের কেজি এখন ৮০০ টাকা, যেখানে ঈদের আগে ছিল ৭৫০–৭৮০ টাকা। দাম বেড়লেও মাংসের ঘাটতি দেখা যায়নি। মাছের বাজারে সামান্য পরিবর্তন, রুই, কাতলা ও তেলাপিয়ার দাম ২০ টাকায় বেড়েছে।
সবজির বাজারে চড়া দর:
গত চার-পাঁচ দিনে কিছু সবজির দাম ২০–৩০ টাকা বেড়ে শতকের ঘরে পৌঁছেছে। চিচিঙ্গা, ঝিঙে ও ধুন্দল ১০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। পটোল ৮০–১০০ টাকা, কাঁকরোল ১৫০–১৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৫৫–৭০ টাকা। আলু ২৫–৩০, পেঁপে ৪০–৫০ টাকায় মিলছে।
বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার বলেন, বৃষ্টির কারণে অনেক সবজি ক্ষেতে নষ্ট হয়েছে। তবে মূল কারণ পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়া। এক মাস আগে ট্রাক ভাড়া ১৫ হাজার, এখন ১৮–২০ হাজার টাকা।
এলপিজি ও ভোক্তা অধিদপ্তরের পরিস্থিতি:
রান্নার গ্যাসের দামও বেড়েছে। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করা হলেও, বাজারে খুচরা বিক্রেতারা ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা জ্বালানি সংকট দেখিয়ে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছেন। র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক আবু ইউসুফ জানান, কঠোর বাজার তদারকি ছাড়া এ সংকট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল জানিয়েছেন, তদারকি কার্যক্রম চলমান। বিশেষ নজর রয়েছে ভোজ্যতেল ও এলপিজি গ্যাসের বাজারে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সরেজমিন পরিদর্শনে আশ্বাস দিয়েছেন, দ্রুতই সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নতি হবে।

