বেসরকারি ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে জ্বালানি তেল কিনে সরবরাহ নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে এ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এপ্রিল মাসে শুধু ডিজেল কেনাতেই প্রায় ১০১ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সময়ে পেট্রোল ও অকটেন কেনায় আরও প্রায় ৫৯ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, বেসরকারি সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি নামের ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে এ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের সময়ে আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত জ্বালানি পরবর্তী সময়ে বিপিসিকে সরবরাহ করা হয়।
সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির শেষে প্ল্যান্টে মোট ৭ কোটি ৯৩ লাখ ৪১ হাজার ১৫২ লিটার কাঁচামাল মজুত ছিল। এর মধ্যে ছিল স্থানীয় ও আমদানি করা কনডেনসেট, অকটেন বুস্টার, এমটিবিই, ন্যাফথা এবং ইআরএল থেকে পাওয়া কাঁচামাল।
ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি অকটেন, পেট্রোল ও আংশিক ডিজেল উৎপাদন করে। তবে ওই মাসে বিপিসিকে ডিজেল সরবরাহ করা হয়নি। একই পরিস্থিতি মার্চ মাসেও দেখা যায়। মার্চ মাসে আবারও অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ করা হলেও ডিজেল সরবরাহ বন্ধ থাকে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির মজুত কাঁচামাল দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল উৎপাদন সম্ভব ছিল। হিসাব অনুযায়ী, কেবল আমদানি করা কনডেনসেট থেকেই প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ লিটার বা প্রায় ১৪ হাজার ৪৮২ টন ডিজেল উৎপাদন করা যেত। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতার তথ্য অনুযায়ী, মাসে ৫০ হাজার টনের বেশি কনডেনসেট প্রসেস করা সম্ভব, যা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি উৎপাদিত হয়।
এপ্রিল মাসের প্রথম ২৪ দিনে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল বিপিসিকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করে। এই সময়েই শুধু ডিজেল কেনায় অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০১ কোটি টাকা। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম মার্চ ও ফেব্রুয়ারির তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফেব্রুয়ারির তুলনায় এপ্রিল মাসে প্রতি লিটারে প্রায় ৭১ টাকার বেশি দামে ডিজেল কেনা হয়। ফলে মোট ১২ হাজার টন ডিজেল কেনায় বিপিসির অতিরিক্ত ব্যয় হয় ১০১ কোটি টাকার বেশি।
শুধু ডিজেল নয়, অকটেন ও পেট্রোল কেনাতেও বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে। ফেব্রুয়ারির কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য এপ্রিল মাসে বেশি দামে কেনায় অকটেনে প্রায় ৩১ কোটি টাকা এবং পেট্রোলে প্রায় ২৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে হিসাব পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে এই দুই জ্বালানি পণ্যে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৯ কোটি টাকা।
বিপিসির একটি প্রাইসিং কমিটি জ্বালানি কেনার দাম নির্ধারণ করে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং কাঁচামালের আগের দামের প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পুরোনো কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত জ্বালানির দাম আগের বাজারমূল্যের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে বিপিসির পরিচালক (অর্থ) জানান, নির্ধারিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ীই মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং সব তথ্য সবসময় পুরোপুরি হাতে থাকে না।
এ বিষয়ে একজন জ্যেষ্ঠ সাবেক বিপিসি কর্মকর্তা দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর পর বাজার পরিস্থিতি বদলালেও কাঁচামালের পুরোনো মজুতের প্রভাব যথাযথভাবে মূল্য নির্ধারণে বিবেচনা করা হয়নি। অন্যদিকে সুশাসন বিশেষজ্ঞরা এই খাতকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনিয়মে জর্জরিত বলে মন্তব্য করেছেন এবং তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী এবং বিপিসির সংশ্লিষ্ট কমিটির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি কেনা ও মূল্য নির্ধারণের এই জটিল প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এক মাসের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধি ও পুরোনো মজুতের প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা না করার ফলে শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের।
সিভি/এম

