দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আশা জাগিয়েছিল সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। কিন্তু কমিশনিংয়ের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি প্রকল্পটি। অপারেটর নিয়োগে জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরে কার্যত অলস পড়ে আছে প্রায় ৮,২২২ কোটি টাকার এই অবকাঠামো।
সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম হলো সমুদ্রের ভেতরে স্থাপিত একটি ভাসমান জেটি। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ অফশোর ও অনশোর পাইপলাইন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি উপকূলীয় ডিপোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা সম্ভব, ফলে ছোট লাইটার জাহাজ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুই-ই কমে আসে।
কক্সবাজারের মাতারবাড়ী দ্বীপ থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে সাগরে স্থাপিত এই এসপিএম দুটি পাইপলাইনের সঙ্গে সংযুক্ত। বড় মাদার ট্যাংকার থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি প্রথমে মহেশখালীর স্টোরেজ টার্মিনালে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারির ফ্যাসিলিটিতে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে এর কমিশনিং সম্পন্ন হয়।
প্রথমে নির্মাণকারী চীনা ঠিকাদারকেই অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। এরপর দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অপারেটর চূড়ান্ত করা যায়নি। প্রথম দফার দরপত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটি ও সীমিত প্রতিযোগিতার কারণে তা বাতিল করা হয়। পরে পরামর্শক সংস্থা আইএলএফ কনসাল্টিংয়ের সহযোগিতায় নতুন করে দরপত্র দলিল প্রস্তুত করে আবারও আহ্বান জানানো হয়। ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়। তবে প্রক্রিয়াটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বিপিসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসপিএম পুরোপুরি চালু হলে দেশের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ টন বাড়বে। এতে প্রায় ১০ দিনের জাতীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এছাড়া বর্তমানে সমুদ্র থেকে তেল খালাসে যেখানে প্রায় ১১ দিন সময় লাগে, এসপিএম ব্যবস্থায় তা কমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নেমে আসবে। লাইটার জাহাজ ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকায় বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।
দরপত্র প্রক্রিয়াকে ঘিরে একাধিক প্রশ্নও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শর্তাবলি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই অংশ নিতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিপিপিইসি) লিমিটেডকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে থেকেই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের জন্য যে পরামর্শক সংস্থা কাজ করেছে, তারা আগে একই নির্মাণ ঠিকাদারের সঙ্গে অন্য প্রকল্পে যুক্ত ছিল। এতে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরামর্শক সংস্থার ফি কমানো নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। ফলে দরপত্র মূল্যায়ন কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে।
এর আগের দরপত্রে এক ডজনের বেশি কোম্পানি অংশগ্রহণ করলেও মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়। এর মধ্যে সিপিপিইসি–ব্লুওয়াটার যৌথ উদ্যোগকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পারতামিনার দর প্রস্তাব বাজেটের তুলনায় বেশি হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর শর্তের কারণে আন্তর্জাতিক মানের একাধিক এসপিএম অপারেটর এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে গেছে।
২০১৫ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়ন সময় ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ঋণচুক্তি কার্যকর হয় ২০১৮ সালে। এরপর চার দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং ব্যয়ও বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকায়, যা প্রায় ৬৭ শতাংশ বেশি। ফলে তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে সময় লেগেছে প্রায় নয় বছর। কমিশনিং সম্পন্ন হলেও অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় প্রকল্পটি এখনো পূর্ণ কার্যক্রমে যেতে পারেনি।
শুরুতে বিশেষ বিধানের আওতায় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকেই অপারেটর হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত ছিল। পরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আবারও একই চীনা প্রতিষ্ঠানকে জিটুজি ভিত্তিতে নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে সমালোচনার মুখে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সেই সিদ্ধান্তও বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্রের পথে যায় সরকার।
বুয়েটের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা জরুরি। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যয় বৃদ্ধি, সময় বাড়ানো এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও অগ্রগতি জানতে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক, বিপিসি ও ইআরএল-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। এমনকি বিপিসি চেয়ারম্যানকেও ফোনে পাওয়া যায়নি।

