দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, খেলাপি ঋণ এবং আস্থার সংকটে ভুগতে থাকা দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলতে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক সংস্কার কার্যক্রমের প্রভাবে গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি হওয়ায় আমানত ও আমানতকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও একই সময়ে ঋণ বিতরণে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এনবিএফআই খাতের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৫৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তিন মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ১২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ফলে এক প্রান্তিকে আমানত বেড়েছে ৪৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা প্রবৃদ্ধির হিসেবে প্রায় শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এ খাতে আমানত বাড়ছে। ২০২৫ সালের মার্চে যেখানে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকার কিছু বেশি, সেখানে ধাপে ধাপে তা বেড়ে চলতি বছরের মার্চে ৫১ হাজার ৫০০ কোটির বেশি অতিক্রম করেছে। এটি খাতটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসার ইঙ্গিত বহন করছে।
শুধু আমানতের পরিমাণই নয়, বেড়েছে আমানতকারীর সংখ্যাও। চলতি বছরের মার্চ শেষে এনবিএফআই খাতে আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২২ হাজার ৭২৬ জন। মাত্র তিন মাস আগে এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৮২ জন। অর্থাৎ এক প্রান্তিকেই নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ৫১ হাজারের বেশি গ্রাহক, যা প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের মার্চে এ খাতে আমানতকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪১ হাজার। এরপর প্রতিটি প্রান্তিকেই নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অস্থিরতার পর গ্রাহকদের এই প্রত্যাবর্তন খাতটির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সতর্কতা অবলম্বন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে খাতটির মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৪২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এটি প্রায় ৪০৪ কোটি টাকা কম। শতাংশের হিসেবে ঋণ কমেছে শূন্য দশমিক ৫১ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ বিতরণে এই সংকোচনকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হচ্ছে। ফলে অযাচিত ঋণ বিতরণ কমে আসলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের চাপও কমতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান মনে করেন, খাতটির বর্তমান প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। তাঁর মতে, আমানত বৃদ্ধির পেছনে গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসার প্রাথমিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তবে এ ধারা ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতি ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, এনবিএফআই খাত দেশের বিনিয়োগ ও শিল্প অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, করপোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে খাতটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। ফলে অনেক আমানতকারী তাদের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন।
সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং তদারকি জোরদারের ফলে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এনবিএফআই খাত আবারও দেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী বিকল্প অর্থায়ন খাত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বর্তমান ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু আমানত নয়, বিনিয়োগ ও ঋণ কার্যক্রমেও নতুন গতি আসবে। এতে আর্থিক খাতের বৈচিত্র্য বাড়ার পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসা খাতের অর্থায়নেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

