দশকের পর দশক ধরে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজারে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে চীন। তার পরের অবস্থান দীর্ঘদিন ছিল বাংলাদেশের। তবে সেই ধারাবাহিকতায় আবারও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে ভিয়েতনাম।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার নতুন সমীকরণ এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনের প্রভাবে এ অবস্থান বদল ঘটে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ভিয়েতনামের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর এবং বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, মাত্র ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের ব্যবধানে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থান হারিয়েছে।
এর আগেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ২০২০ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় অবস্থান হারায়। সে বছর বাংলাদেশ রপ্তানি করে ২৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক, যেখানে ভিয়েতনাম ছিল ২৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে। পরের বছর ২০২১ সালে বাংলাদেশ আবার দ্বিতীয় অবস্থান ফিরে পায় এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত তা ধরে রাখে। কিন্তু ২০২৫ সালে আবারও সেই অবস্থান হারাতে হয়।
চায়না কাস্টমস স্ট্যাটিস্টিক্স অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চীনের তৈরি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের রপ্তানি ১৫১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এতে স্পষ্ট হয়, বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে চীন এখনো এককভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলেও তাদের ব্যবসায়িক মডেল ভিন্ন।
বাংলাদেশ মূলত স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বড় পরিসরে বেসিক গার্মেন্টস উৎপাদনই দেশের প্রধান শক্তি। কম দামে বেশি উৎপাদনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান তৈরি করেছে দেশটি। অন্যদিকে ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে উচ্চ ও মধ্যম মানের পোশাক উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈচিত্র্যময় পণ্য এবং উন্নতমানের উৎপাদনের মাধ্যমে তারা একটি আধুনিক রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সিপিডির সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের বহুমুখী পণ্যের সক্ষমতা। তারা বিভিন্ন মানের পোশাক উৎপাদন করে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যার কারণে বাজার পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়।
ভিয়েতনামের অগ্রগতির পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। তারা তুলনামূলক দ্রুত কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে। যেমন চীন থেকে ভিয়েতনাম এক সপ্তাহের মধ্যে কাঁচামাল আনতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে একই প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় এক মাস। ফলে লিড টাইম বেড়ে যায় এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে দেশটি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ভিয়েতনামের সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা তাদের বড় সুবিধা। উন্নত লজিস্টিকস, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী শিল্প কাঠামো তাদের বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভিয়েতনামের বাণিজ্য চুক্তি তাদের বাজার সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবর্তনের প্রভাব:
বিশ্ববাণিজ্যে সাম্প্রতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ, ভিয়েতনামের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে। তারা সেই সুযোগ দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। ইউরোপীয় বাজারে চীন ও ভারতের সঙ্গে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতাও বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার পেছনে কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সীমিত পণ্য বৈচিত্র্য। এসব কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যা নীতিগত ও অবকাঠামোগত। স্নোটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ বলেন, ভিয়েতনামের শক্তির জায়গা তাদের দ্রুত সরবরাহ শৃঙ্খল এবং উৎপাদন দক্ষতা। তারা বৈশ্বিক ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দিতে হবে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:
বাংলাদেশ এখনো বড় সম্ভাবনার দেশ। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে ম্যান-মেড ফাইবার খাতে বিনিয়োগ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ শুধু অর্থ নয়, বরং প্রযুক্তি ও দক্ষতাও নিয়ে আসে, যা শিল্পকে আধুনিক করতে সাহায্য করে। তিনি আরও বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে নতুন বাণিজ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
ভবিষ্যতে দ্বিতীয় অবস্থান ফিরে পেতে হলে বাংলাদেশকে আরও কৌশলগত বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু পোশাক খাতে নয়, অন্যান্য খাতেও পারস্পরিক সুবিধা তৈরি করতে হবে। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু কম দামের ওপর নির্ভর করছে না। বরং প্রযুক্তি, বৈচিত্র্য, সরবরাহ সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সংযোগই নির্ধারণ করছে কার অবস্থান কোথায় থাকবে।

