দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি সার কারখানা সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল অ্যামোনিয়ার ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুন করে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অ্যামোনিয়ার প্রধান উৎস চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। মার্চের শুরুতে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় দেশের কয়েকটি বড় ইউরিয়া কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়, যা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।
এরই ধারাবাহিকতায় ডিএপি কারখানায় থাকা অ্যামোনিয়ার মজুত শনিবার শেষ হয়ে যায় এবং একই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফসফরিক অ্যাসিড পর্যাপ্ত থাকলেও অ্যামোনিয়া ছাড়া সার উৎপাদন সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত এই কারখানাটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প করপোরেশনের অধীন পরিচালিত হয় এবং এটি দেশের একমাত্র ডিএপি সার উৎপাদন কেন্দ্র। ২০০৬ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকা এই কারখানার দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ৮০০ টন।
সাধারণভাবে কারখানাটি দৈনিক প্রায় ৫০০ টন সার উৎপাদন করে, যেখানে কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা ফসফরিক অ্যাসিড এবং স্থানীয়ভাবে সরবরাহকৃত অ্যামোনিয়া ব্যবহার করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকটের কারণে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সর্বশেষ ৩ হাজার টন অ্যামোনিয়ার একটি চালান কিছু সময় উৎপাদন সচল রেখেছিল, তবে নতুন সরবরাহ না আসায় কারখানাটি এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে সার চাহিদা প্রায় ৬.৫ থেকে ৬.৯ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি, এনপিকে এবং অন্যান্য যৌগিক সার অন্তর্ভুক্ত। চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়, বিশেষ করে ডিএপি সার প্রায় ১৪ লাখ টন বিদেশ থেকে আনা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু উৎপাদন নয়, আমদানি ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক জটিলতার কারণে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুটে বিঘ্নের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর আগে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা একসঙ্গে সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এটি ১৫ দিনের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখনো অনেক কারখানা পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার টন সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা কৃষি খাতে সরবরাহ ঘাটতির শঙ্কা বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ আশা করছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু হলে অ্যামোনিয়া উৎপাদন শুরু হবে এবং ধাপে ধাপে ডিএপি কারখানাও আবার সচল করা সম্ভব হবে। তবে তা নির্ভর করছে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

