আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশজুড়ে ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিনামূল্যে প্রায় ১০ হাজার টন লবণ বিতরণ করবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন। চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়া ঠেকাতে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এ কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবার সারা দেশে মোট ৯ হাজার ৮০০ টনের বেশি লবণ বিতরণ করা হবে। জেলার ভিত্তিতে চাহিদা ও কোরবানির পরিমাণ বিবেচনায় বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লবণ বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম, প্রায় ১ হাজার ৫ টন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে বান্দরবানের জন্য, মাত্র ১৫ টন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় বিপুল সংখ্যক পশু কোরবানি হয়। এসব পশুর চামড়া দেশের মাদরাসা, এতিমখানা ও বিভিন্ন ধর্মীয়-সামাজিক প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করে থাকে। তবে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে সময়মতো লবণ না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় গত বছর প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী বিনামূল্যে লবণ বিতরণের উদ্যোগ নেয় বিসিক। শুরুতে ৩০ হাজার টন বিতরণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে মাঠ প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী ১১ হাজার ৫৭১ টন লবণ সরবরাহ করা হয়। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এসব লবণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
তবে চলতি বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে দেশে লবণ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে বাজারে লবণের দাম দ্রুত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারকে একই বাজেটে কম পরিমাণ লবণ বরাদ্দ দিতে হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশে ২৫ লাখ টনের বেশি লবণ উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টনের কাছাকাছি। ফলে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণের দাম প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ লবণ ৪৫০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে এবার আগের বছরের তুলনায় প্রায় পৌনে দুই হাজার টন কম লবণ বিতরণ করা হবে। তবে বিসিক বলছে, সীমিত বরাদ্দের মধ্যেও যাতে চামড়া সংরক্ষণে কোনো বড় সংকট না হয়, সে লক্ষ্যেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
লবণ সরবরাহে অনিয়ম ঠেকাতে এবং সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করতে বেশ কিছু নির্দেশনাও জারি করেছে বিসিক। শুধুমাত্র নিবন্ধিত ও সক্রিয় মিলগুলোর মাধ্যমে লবণ সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলাভিত্তিক মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা পুরো কার্যক্রম তদারকি করবে।
এবার লবণের দরও জেলা অনুযায়ী নির্ধারণ করে দিয়েছে সংস্থাটি। কক্সবাজার অঞ্চলে তুলনামূলক কম দাম রাখা হলেও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় দর কিছুটা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি টনে ভ্যাট ও পরিবহন খরচও যুক্ত করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগাম বৃষ্টির কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি ঈদের আগে পরিবহন সংকট ও বাড়তি ভাড়ার কারণেও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। তারপরও সরকার আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী খাত। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়ার বড় অংশ থেকেই এ শিল্পের কাঁচামাল আসে। তাই চামড়া সংরক্ষণে সময়মতো লবণ সরবরাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা চামড়া নষ্ট হলে শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো চামড়া শিল্পই ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই সরকারি এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কোরবানির মৌসুমে চামড়া নষ্ট হওয়ার হার অনেকটাই কমে আসতে পারে।

