চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে এক মাসের ব্যবধানে আদার দামে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। একই সঙ্গে বাড়ছে দেশি পেঁয়াজের দাম। পাইকারি বাজারে অন্য মসলার দাম স্থিতিশীল থাকলেও খুচরা বাজারে সব পণ্যই বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বাজার তদারকির দুর্বলতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
খাতুনগঞ্জের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক মাস আগে চায়না আদা প্রতি কেজি বিক্রি হতো ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত রমজানে চায়না আদার আমদানি হলেও বিক্রি কম ছিল। অনেক পণ্য গুদামে পড়ে থেকে মান নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি গত দুই মাসে ব্যবসায় লোকসান হয়েছে বলেও দাবি তাদের। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চাহিদা বেড়েছে, বিশেষ করে চায়না আদার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে বলে জানান তারা।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানায়, বেশি দামে বিক্রি এবং ক্রয় ভাউচার না রাখার প্রমাণ পাওয়ায় গত রোববার খাতুনগঞ্জে দুই আড়তদারকে মোট ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাইকারি দামের এই ঊর্ধ্বগতি খুচরা বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। কয়েক দিন আগে খুচরায় চায়না আদা বিক্রি হয়েছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়।
পেঁয়াজের বাজারেও দেখা দিয়েছে চাপ। খাতুনগঞ্জে দেশি হালি পেঁয়াজের দাম ধাপে ধাপে বাড়ছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২৮ টাকায়। পরে তা বেড়ে ৩৩ টাকা এবং বর্তমানে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে রসুনের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। চায়না রসুন বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। খুচরা বাজারেও দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। কয়েক দিন আগে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকায়। বর্তমানে তা ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস জানান, রমজান ও পরবর্তী সময়ে আদার বাজারে লোকসান হয়েছে। সে কারণে আমদানিতে আগ্রহ কমেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। পেঁয়াজের দামও ওঠানামার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি জানান।
নগরের হালিশহরের খুচরা ব্যবসায়ী মো. নাছির উদ্দিন বলেন, পাইকারিতে দাম বাড়লে তার প্রভাব খুচরায় পড়া স্বাভাবিক। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় দাম আরও বেড়ে যায়।
শুধু আদা ও পেঁয়াজ নয়, খাতুনগঞ্জে বিভিন্ন মসলার দামও খুচরা পর্যায়ে অনেক বেশি। পাইকারি বাজারে জায়ফল প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা হলেও খুচরায় তা ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। দারুচিনি ৩৫০ থেকে ৪৪০ টাকার বিপরীতে খুচরায় ৬০০ টাকা, গোলমরিচ ১ হাজার ২০ টাকার বিপরীতে ১ হাজার ৬০০ টাকা, এলাচ ৪ হাজার ৩০০ টাকার বিপরীতে ৫ হাজার টাকা, হলুদ ১৮০ টাকার বিপরীতে ৩০০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ২৩০ টাকার বিপরীতে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নগরের পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা মো. আবদুল ওয়াহাব বলেন, উৎসব এলেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মসলা পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে এলাচ ১ হাজার ১৫০ টন, দারুচিনি ১৩ হাজার ২৯৬ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৫০ টন, জিরা ৩ হাজার ১১৫ টন, জয়ত্রী ৩৫০ টন, জায়ফল ৩৩৬ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৯৫৯ টন, আদা ৪৫ হাজার ৫৩৮ টন এবং রসুন ৫৩ হাজার ১০১ টন আমদানি হয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে সুযোগ পেলেই কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দেন। মসলার দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করা জরুরি। ঈদ সামনে রেখে বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন ছিল। সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম না থাকায় ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্লাহ জানান, অভিযানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় দুই আড়তদারকে জরিমানা করা হয়েছে। বাজারে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং বাড়তি দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই।

