আসন্ন জাতীয় বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা আসছে। আগামী দুই করবর্ষে সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ, চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর করের চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা রয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত সুবিধার আওতায় আসবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্র বলছে, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার চাপ বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ও কর ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নতুন কর কাঠামো ২০২৬-২০২৭ এবং ২০২৭-২০২৮—এই দুই করবর্ষের জন্য কার্যকর রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। এরপরের ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। পরবর্তী ৪ লাখ টাকায় করহার ধরা হয়েছে ১৫ শতাংশ। এরপরের ৫ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া তার পরবর্তী ২০ লাখ টাকা আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ এবং বাকি আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে।
বর্তমান অর্থবছরের কর কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, আগে করমুক্ত সীমার পর প্রথম ধাপে ৫ শতাংশ কর দিতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় সেই ধাপ বাদ দিয়ে করহার পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর চাপ কিছুটা কমবে, তবে উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে করের বোঝা আগের মতোই থাকবে।
বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও বাড়ানো হচ্ছে করমুক্ত আয়সীমা। আগামী দুই করবর্ষে নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতারা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত সুবিধা পাবেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ টাকা। গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা করা হচ্ছে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। একই পরিমাণ সুবিধা বহাল থাকছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের ক্ষেত্রেও।
এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ শ্রেণির করদাতাদের জন্য সীমা ছিল ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ফলে নতুন বাজেটে তাদের জন্যও অতিরিক্ত কর সুবিধা যুক্ত হচ্ছে।
রাজস্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। একই সঙ্গে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় করদাতাদের বাস্তব চাপ আগের চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে করমুক্ত সীমা বাড়ানো হলে মানুষের হাতে কিছু অতিরিক্ত অর্থ থাকবে, যা ভোগব্যয় ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু করমুক্ত সীমা বাড়ালেই হবে না, কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করাও জরুরি। অনেক নতুন করদাতা এখনও জটিল নিয়ম ও প্রক্রিয়ার কারণে রিটার্ন জমা দিতে নিরুৎসাহিত হন। তাই করহার পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা বাড়ানো এবং হয়রানি কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আগামী বাজেটে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হলে কয়েক কোটি সম্ভাব্য করদাতার মধ্যে স্বস্তির বার্তা পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ও স্থির আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

