বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরোক্ষ করনির্ভর বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাট, আমদানি শুল্ক ও সম্পূরক শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং আয়বৈষম্য আরও গভীর করছে। একই সঙ্গে এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত গবেষণায় দেখা যায়, মোট রাজস্ব আয়ের ৭৮ দশমিক ২ শতাংশই বাংলাদেশে আসে পরোক্ষ কর থেকে। এই হার আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। শুধু ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক হিসাব করলেও বাংলাদেশের নির্ভরতা দাঁড়ায় ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ভারতের তুলনায়ও অনেক বেশি।
গবেষণাটি উপস্থাপন করেন স্ম্যাক অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া। ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত ওই আলোচনা সভায় দেশের অর্থনীতি, করনীতি ও ব্যবসা খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরোক্ষ করের গড় নির্ভরতা ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। সেখানে ভিয়েতনামে এ হার ৬০ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরোক্ষ করের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এটি ধনী ও গরিব উভয়ের ওপর প্রায় একই হারে প্রভাব ফেলে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয়ের বড় অংশ কর হিসেবে ব্যয় হয়ে যায়। অন্যদিকে প্রত্যক্ষ কর, যেমন আয়কর বা সম্পদভিত্তিক কর, তুলনামূলকভাবে বেশি ন্যায্য এবং বৈষম্য কমাতে সহায়ক।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামোতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। তার মতে, সরকার সহজে আদায় করা যায় বলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে, কিন্তু এতে করজাল সম্প্রসারণ এবং প্রত্যক্ষ করভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ পিছিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, যত দিন এই নির্ভরতা থাকবে, তত দিন করব্যবস্থা বৈষম্যমূলকই থেকে যাবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও আয়বৈষম্য নিয়ন্ত্রণেও সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। তিনি আরও সতর্ক করেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আমদানি শুল্কভিত্তিক রাজস্ব কাঠামো বড় চাপে পড়বে।
তার ভাষায়, বর্তমানে মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ২৭ থেকে ২৮ শতাংশই আসে শুল্ক থেকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা কমে গেলে এই আয় ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই এখন থেকেই ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ করনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফারিদি বলেন, অতিরিক্ত পরোক্ষ করনির্ভরতা বাজেট বাস্তবায়নেও অস্থিরতা তৈরি করে। কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে গেলে ভোগব্যয়ও কমে যায়, ফলে সরকারের রাজস্ব আয় দ্রুত কমতে শুরু করে। তখন সরকারকে হয় ব্যয় কমাতে হয়, না হয় ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়। তিনি আরও বলেন, পরোক্ষ করের কারণে সাধারণ মানুষ প্রায়ই বুঝতে পারেন না তারা কত কর দিচ্ছেন। এতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সামাজিক চাপও দুর্বল হয়ে পড়ে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, দেশের ভ্যাট হার কোনো অবস্থাতেই ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কর সংস্কার টাস্কফোর্সও একই সুপারিশ করেছিল বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও কর ব্যবস্থার জটিলতা নিয়ে কথা বলেন। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, বর্তমান কর নির্ধারণ পদ্ধতি অকার্যকর এবং পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল সমন্বয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন। তার দাবি, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক হয়রানি ও অনানুষ্ঠানিক চাপের কারণে ব্যবসায়ীরা কর ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন।
র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক এম আবু ইউসুফ বলেন, দেশে কর সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ধারণা বা পরিকল্পনার অভাব নেই। মূল সমস্যা বাস্তবায়নে দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি। আলোচনায় ভারতের জিএসটি ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার উদাহরণও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, ভারতের মতো প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তুলতে পারলে করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আদায় দুটোই সহজ হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান করব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তানির্ভর হওয়ায় সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বাড়তি করের চাপও বহন করছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ানো এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

