চলতি অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানির দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি একদিকে যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি এতে ব্যয়ের চাপও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, এবার আমদানি ব্যয় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২০১৩–১৪ অর্থবছরে প্রথম ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। শুরুতে মাত্র ৫০০ মেগাওয়াটের চুক্তি থাকলেও পরে তা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি নিয়মিতভাবে চালু থাকে। পরে ২০২৩ সাল থেকে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র যুক্ত হয় আমদানি ব্যবস্থায়। সর্বশেষ নেপাল থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হলে উৎসের সংখ্যা আরও বাড়ে।
পিডিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে ভারত ও নেপাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ আমদানি দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৭৮৯ কোটি ইউনিটের কাছাকাছি। এর বিপরীতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি। ফলে গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের আমদানি ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১১ টাকা ৮০ পয়সা, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল কিছুটা কম, প্রতি ইউনিটে প্রায় ১১ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইউনিটপ্রতি ব্যয় আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে মোট আমদানির পরিমাণও প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি খরচের ওঠানামা, চুক্তিভিত্তিক দামের কাঠামো এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এতে স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় আমদানি বিদ্যুতের অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
পিডিবির অতীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সে বছর ইউনিটপ্রতি গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১১ টাকা ৫৪ পয়সা। পরবর্তী অর্থবছরে নেপাল থেকে সীমিত আমদানি যুক্ত হলেও ব্যয় কমেনি; বরং গড় মূল্য আরও বেড়ে যায়।
এর আগে ২০২২–২৩ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৮ টাকা ৭৭ পয়সা। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বিদ্যুৎ আমদানির খরচে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এসব চুক্তির মেয়াদ ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে আদানি গড্ডা প্রকল্প থেকে এককভাবে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ আসছে, যা দেশের মোট আমদানির একটি বড় অংশ। নেপাল থেকেও সীমিত আকারে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হলেও তা এখনো মৌসুমি ও তুলনামূলক কম সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। বিশেষ করে ডলার-নির্ভর পেমেন্ট ব্যবস্থায় ব্যয়ের প্রবণতা ভবিষ্যতে বাজেট ঘাটতিও বাড়াতে পারে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে আমদানি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। চলতি অর্থবছরের প্রবণতা বলছে, বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ ও ব্যয়—দুটিই ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে এ খাতের আর্থিক চাপ আরও বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

