দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে অনিশ্চয়তা যেন দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোথাও আর্থিক সংকটে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, কোথাও আবার ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে হাজারো শ্রমিকের জীবনে। অনেকেই চাকরি হারানোর পাশাপাশি এখনো বকেয়া বেতন, ভাতা ও প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত।
গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডায়িং এবং ইউনিক ডিজাইনার্স কারখানা গত ১৬ জুন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই দুটি কারখানায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। আর্থিক সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হলেও এখনো শ্রমিকেরা তাঁদের বকেয়া বেতন-ভাতা ও ক্ষতিপূরণ পাননি।
শুধু এই দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, প্রায় প্রতি মাসেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে। আবার বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে শ্রমিক ছাঁটাইও চলছে। ফলে শত শত শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। তাঁদের অনেকেই আইন অনুযায়ী পাওনা অর্থও বুঝে পাচ্ছেন না।
শিল্প পুলিশ, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মী।
পোশাকশিল্প মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় নতুন নিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে। এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে সামনে আরও কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিকনেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, ক্রয়াদেশ কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এতটা সংকটপূর্ণ নয়। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি খুব বেশি কমেনি। তাঁদের অভিযোগ, কারখানা বন্ধ বা ক্রয়াদেশের অজুহাতের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া শ্রমিকদেরও বিভিন্ন অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) রপ্তানি হয়েছে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম।
শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের আটটি শিল্পাঞ্চলের ৭৯টি কারখানা থেকে ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে সাভার-আশুলিয়ার ৩৫টি, গাজীপুরের ৩৩টি, চট্টগ্রামের ৫টি, নারায়ণগঞ্জের ৩টি, খুলনার ২টি এবং ময়মনসিংহের একটি কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই তৈরি পোশাকশিল্পের।
সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই হয়েছে মার্চ ও মে মাসে। মার্চে ৩০টি এবং মে মাসে ২৯টি কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। এই দুই মাসেই পালিত হয় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহার পর সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপ তাদের তিনটি কারখানা থেকে ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করে।
অন্যদিকে বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সংগঠনটির সদস্যভুক্ত ৮০টি কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের ১৮টি, সাভার-আশুলিয়ার ২২টি এবং গাজীপুরের ৪০টি কারখানা রয়েছে। এই ৮০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৭টি ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি কারখানাগুলো এখনো চালু রয়েছে।
শিল্প পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গাজীপুরের ৪৪টি কারখানায় ২ হাজার ১৫৫ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি কারখানা ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ও আর্থিক সংকটের কারণে ৫৫৬ শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এপিএস অ্যাপারেলস, ইভিন্স টেক্সটাইল, ন্যাশনাল পলিমার, সেগ ফ্যাশন এবং বেলিসিমা অ্যাপারেলস। সবচেয়ে বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করেছে এপিএস অ্যাপারেলস ও ইভিন্স টেক্সটাইল।
এ ছাড়া আরও ৩৭টি কারখানায় ১ হাজার ৫৯৯ শ্রমিককে বিভিন্ন কারণে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্দোলনে অংশগ্রহণ, উৎপাদন ব্যাহত করা, অসদাচরণ এবং কাগজপত্রে জালিয়াতির মতো অভিযোগে এসব শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপনের মতে, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের নিয়ম সহজ হওয়ার পর অনেক শ্রমিক সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মালিকদের একটি অংশ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না। ফলে ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগে যুক্ত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।
উল্লেখ্য, গত নভেম্বরে শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করা হয়। পরে সেটি আইনে পরিণত হয়। নতুন আইনে কোনো কারখানায় মাত্র ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতেই ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা সম্ভব। এর আগে মোট শ্রমিকের ২০ শতাংশের সম্মতি বাধ্যতামূলক ছিল।
ঈদুল আজহার ছুটির পর জুনের শুরুতে সাভারের উলাইল এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা একযোগে ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করে। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের তালিকা কারখানার প্রবেশপথের পাশের দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
পরে প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান জানান, ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় শ্রম আইনের ২০ ধারার আওতায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।
একাধিক পোশাকশিল্প মালিকের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে ধাক্কা খায়। পাশাপাশি ইউরোপের বাজারেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। পরে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এসব কারণে রপ্তানি কমে যাওয়ায় কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা বেড়েছে বলে তাঁদের দাবি।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ক্রয়াদেশের ঘাটতি, ব্যাংকিং জটিলতা এবং অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসা থেকে সরে যাওয়ার কারণে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। তবে একই সময়ে নতুন কারখানাও গড়ে উঠছে। ফলে সামগ্রিক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ১৯ হাজারেরও বেশি হতে পারে, কারণ সব কারখানা সংগঠনকে তথ্য দেয়নি।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ নেই। তাই প্রতি মাসেই কিছু কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। তাঁর মতে, ক্রয়াদেশের সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকের কঠোর নীতির কারণে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা না পাওয়াও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের বেআইনিভাবে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতারের মতে, সরকার বন্ধ কারখানা চালুর জন্য প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে। এই সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যেও কেউ কেউ সচল কারখানা বন্ধ করতে পারে। তাই কোন কারণে কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকেরা তাঁদের আইনগত ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন কি না, তা সরকারিভাবে তদন্ত করা জরুরি।

