দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও আধুনিক করার লক্ষ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠকে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬, জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) এবং আমদানি নীতি আদেশ (২০২৬-২০২৯)-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা গ্রহণ আরও সহজ হবে।
নতুন আইনের আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) কার্যক্রম সমন্বয় করে একটি কেন্দ্রীয় বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে বিনিয়োগকারীদের নিবন্ধন, অনুমোদন, লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সেবা একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলও একই নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হবে। পাশাপাশি অনুমোদনের সময়সীমা নির্ধারণ এবং সরকারি অব্যবহৃত সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সময়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবহার অন্তত ১৫ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই কৌশলের আওতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং, স্মার্ট গ্রিড, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিশেষ তহবিল, সহজ ঋণ, কর সুবিধা, কার্বন ক্রেডিট এবং স্থানীয় শিল্পে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। দক্ষ জনবল তৈরিতে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে চালু হবে রিয়েল-টাইম অনলাইন ড্যাশবোর্ড।
নতুন আমদানি নীতিতে এলসির পাশাপাশি সেলস কনট্রাক্টের ভিত্তিতে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পণ্য আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত আধুনিক আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি, যেমন ওপেন অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুযোগও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত হয়েছে। সরকারের আশা, এতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও পুনঃরপ্তানি কার্যক্রমে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিধানও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্প খাতে বিনিয়োগ সহজ করতে বিশেষ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কাস্টমস ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট, ই-লাইসেন্স, অনলাইন সনদ এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থাও নীতিতে যুক্ত হয়েছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় রেখে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কীটনাশকের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

